যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্প ইরানকে হুঁশিয়ারি দিয়েছেন। বলেছেন, তেহরান যদি ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে না দেয়, তবে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলো ‘ধ্বংস করে দেবে’। যুদ্ধ ‘ধীরে ধীরে শেষ করার’ কথা বলার মাত্র একদিন পরই এমন নাটকীয় হুমকি দিলেন তিনি। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ২১শে মার্চ ট্রাম্প লিখেছেন, ‘যদি ইরান এই মুহূর্ত থেকে ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে কোনো ধরনের হুমকি ছাড়া হরমুজ প্রণালি পুরোপুরি খুলে না দেয়, তাহলে যুক্তরাষ্ট্র তাদের বিভিন্ন বিদ্যুৎকেন্দ্রে হামলা চালাবে এবং ধ্বংস করে দেবে। সবচেয়ে বড়টি দিয়ে শুরু করা হবে।’
এ খবর দিয়ে বার্তা সংস্থা রয়টার্স বলছে, ট্রাম্পের এই আল্টিমেটাম কার্যকর হলে যুক্তরাষ্ট্রের হামলার পরিধি এমন অবকাঠামো পর্যন্ত বিস্তৃত হবে, যা ইরানের সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে সরাসরি প্রভাবিত করে। ইরানের হামলার আশঙ্কায় অধিকাংশ জাহাজ এখন হরমুজ প্রণালি দিয়ে চলাচল করছে না। এই সরু সমুদ্রপথ দিয়ে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তেল ও তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস পরিবহন করা হয়। প্রণালিটি প্রায় বন্ধ হয়ে যাওয়ায় গত সপ্তাহে ইউরোপে গ্যাসের দাম প্রায় ৩৫ শতাংশ পর্যন্ত বেড়ে যায়।
ইরানের সামরিক কমান্ড সদরদপ্তর খাতাম আল-আনবিয়া সেন্ট্রাল হেডকোয়ার্টার্স ২২ মার্চ জানায়, যুক্তরাষ্ট্র যদি ইরানের জ্বালানি ও শক্তি অবকাঠামোয় হামলা চালায়, তাহলে ইরানও এই অঞ্চলে যুক্তরাষ্ট্রের সব জ্বালানি, তথ্যপ্রযুক্তি এবং লবণাক্ত পানি বিশুদ্ধকরণ অবকাঠামোকে লক্ষ্যবস্তু করবে।
গত সপ্তাহে ইরান তার বৃহৎ গ্যাসক্ষেত্রে ইসরাইলি হামলার জবাবে কাতারের রাস লাফান ইন্ড্রাস্ট্রিয়াল সিটিতে হামলা চালায়। ফলে জ্বালানি বাজারে দামের তীব্র ওঠানামা দেখা যায়। রাস লাফানে বিশ্বের প্রায় এক-পঞ্চমাংশ তরলীকৃত প্রাকৃতিক গ্যাস প্রক্রিয়াজাত করা হয়। হামলায় এমন ক্ষতি হয়েছে, যা মেরামত করতে বহু বছর লাগতে পারে। উপসাগরীয় অঞ্চলের অবকাঠামোর ওপর এই ধরনের হুমকি সংঘাতকে নতুন ও বিপজ্জনক পর্যায়ে নিয়ে গেছে।
দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র
ইসরাইলি কর্মকর্তারা জানান, ইরানি বাহিনী প্রথমবারের মতো দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়েছে, যা মধ্যপ্রাচ্যের বাইরেও হামলার ঝুঁকি বাড়িয়েছে। একই সময়ে ইরানের একটি হামলায় ইসরাইলের একটি পারমাণবিক স্থাপনার কাছাকাছি এলাকায় বহু মানুষ আহত হয়েছে। ইসরাইলি সামরিক প্রধান ইয়াল জামির বলেন, ভারত মহাসাগরে অবস্থিত যুক্তরাষ্ট্র-বৃটেনের সামরিক ঘাঁটি ডিয়েগো গার্সিয়াকে লক্ষ্য করে ৪০০০ কিলোমিটার পাল্লার দুটি ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপ করেছে। ইসরাইলি সামরিক বাহিনী জানায়, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইল ইরানের ওপর হামলা শুরু করার পর এই প্রথম ইরান এত দূরপাল্লার ক্ষেপণাস্ত্র ব্যবহার করেছে। জামির বলেন, এই ক্ষেপণাস্ত্রগুলো ইসরাইলকে আঘাত করার জন্য নয়। এগুলোর পাল্লা ইউরোপের রাজধানীগুলো পর্যন্ত পৌঁছায়। ফলে বার্লিন, প্যারিস ও রোম সরাসরি হুমকির মধ্যে আছে।
বৃটেনের প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয়ের একটি সূত্র জানায়, ২০ মার্চ সরকার আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেয়ার আগেই এই হামলা হয়। বৃটেনের ওই অনুমোদনের ফলে যুক্তরাষ্ট্র বৃটিশ সামরিক ঘাঁটি ব্যবহার করে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র স্থাপনায় হামলা চালাতে পারে। ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের হামলায় ইরানে দুই হাজারের বেশি মানুষ নিহত হয়েছেন। অন্যদিকে যুদ্ধ শুরু হওয়ার পর ইরানের হামলায় ইসরাইলে ১৫ জন নিহত হয়েছে।
পরস্পরবিরোধী বার্তা
যুদ্ধ এখন চতুর্থ সপ্তাহে পড়েছে। এই সময়ে ট্রাম্প ও তার প্রশাসন যুক্তরাষ্ট্রের লক্ষ্য নিয়ে বারবার ভিন্ন ভিন্ন বার্তা দিয়েছে। যার ফলে যুক্তরাষ্ট্রের মিত্ররা কীভাবে প্রতিক্রিয়া জানাবে তা নিয়ে বিভ্রান্তিতে পড়েছে। ২১ মার্চের আল্টিমেটাম ছিল সবচেয়ে আকস্মিক পরিবর্তন। যুদ্ধ কমানোর কথা থেকে হঠাৎই ট্রাম্প ৪৮ ঘণ্টার সময়সীমা বেঁধে দিয়ে ইরানের বিদ্যুৎ অবকাঠামোতে হামলার হুমকি দেন। একই সময়ে যুক্তরাষ্ট্রের মেরিন বাহিনী ও ভারী অবতরণ যানগুলো ওই অঞ্চলের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। শিল্প ও জ্বালানি ডাটাবেস অনুযায়ী, ইরানের সবচেয়ে বড় বিদ্যুৎকেন্দ্রগুলোর মধ্যে রয়েছে তেহরানের কাছে অবস্থিত দমাভান্দ (২৮৬৮ মেগাওয়াট), দক্ষিণ-পূর্বাঞ্চলের কেরমান (১৯১০ মেগাওয়াট) এবং খুজেস্তান প্রদেশের রামিন (১৮৯০ মেগাওয়াট)। দেশটির একমাত্র পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র বুশেহর নিউক্লিয়ার পাওয়ার প্লান্ট দক্ষিণ উপকূলে অবস্থিত এবং এটি প্রায় ১০০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন করে। মার্চের শুরুতে ট্রাম্প ইরানের বিদ্যুৎ গ্রিড ধ্বংস করার ধারণার কথাও তুলেছিলেন, যদিও পরে তা কম গুরুত্ব দিয়ে দেখান। ১১ মার্চ সাংবাদিকদের তিনি বলেন, আমরা চাইলে এক ঘণ্টার মধ্যে তাদের বিদ্যুৎ সক্ষমতা ভেঙে ফেলতে পারি। আর সেটা পুনর্গঠন করতে তাদের ২৫ বছর লাগবে। তবে আদর্শভাবে আমরা সেটা করতে চাই না। যুক্তরাষ্ট্রের ভোটারদের মধ্যে এখন আশঙ্কা বাড়ছে যে যুদ্ধটি আরও বিস্তৃত হতে পারে। জ্বালানির দাম বাড়ায় মূল্যস্ফীতি বাড়ছে, যা ভোক্তা ও ব্যবসা- উভয়ের ওপরই চাপ সৃষ্টি করছে। নভেম্বরে মার্কিন কংগ্রেসের গুরুত্বপূর্ণ মধ্যবর্তী নির্বাচন। তার আগে জনগণের কাছে যুদ্ধের যৌক্তিকতা তুলে ধরতে গিয়ে ট্রাম্পের জন্য এটি বড় রাজনৈতিক ঝুঁকি হয়ে উঠতে পারে। কারণ ওই নির্বাচনে কংগ্রেসের নিয়ন্ত্রণ নির্ধারিত হবে।
ট্রাম্প ন্যাটো মিত্রদেরও সমালোচনা করেছেন। হরমুজ প্রণালি খুলতে সহায়তা করতে অনীহার কারণে তিনি তাদের ‘ভীরু, কাপুরুষ’ বলে অভিযোগ করেছেন। কিছু মিত্র দেশ বলেছে বিষয়টি বিবেচনা করবে। তবে বেশিরভাগ দেশই বলেছে, তাদের সঙ্গে পরামর্শ না করেই শুরু করা এই যুদ্ধে তারা জড়াতে অনিচ্ছুক।
২২ মার্চ ইসরাইলি সামরিক বাহিনী জানায়, তারা তেহরানে হামলা চালাচ্ছে। এর কয়েক ঘণ্টা আগে দক্ষিণ ইসরাইলে হামলা হয়। ২১ মার্চ গভীর রাতে ইরানের ক্ষেপণাস্ত্র দক্ষিণ ইসরাইলের দিমোনা ও আরাদ শহরে আঘাত হানে। পৃথক হামলায় শিশু সহ কয়েক ডজন মানুষ আহত হয়।