রবিবার, ১৯ এপ্রিল ২০২৬, ০৯:০৭ অপরাহ্ন




সরকারের দাবি ও ফিলিং স্টেশনের বাস্তবতা ভিন্ন

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: রবিবার, ১৯ এপ্রিল, ২০২৬ ১০:১৬ am
Fuel oil Steam locomotive fuel ফার্নেস অয়েল Filing stations Filing station ফিলিং স্টেশন Petrol Octane Pump Price পেট্রোল অকটেন পাম্প Fuel energy জ্বালানি তেল Fuel Oil pump তেল ফিলিং স্টেশন
file pic

দেশে জ্বালানি তেলের মজুত পর্যাপ্ত– সরকারের এমন দাবির বাস্তবতা মাঠ পর্যায়ে নেই। রাজধানীসহ দেশের বিভিন্ন এলাকায় ফিলিং স্টেশনের সামনে প্রতিদিন দীর্ঘ হচ্ছে গাড়ির সারি। ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষার পরও তেল না পেয়ে ফিরতে হচ্ছে অনেককে। সংশ্লিষ্ট সবার এখন একটাই প্রশ্ন– পর্যাপ্ত মজুত থাকলে পাম্পে স্বাভাবিক তেল মিলছে না কেন?

সরকারের দেওয়া সর্বশেষ তথ্য অনুযায়ী, বর্তমানে দেশে ডিজেলের মজুত আছে প্রায় ১ লাখ ১ হাজার ৩৮৫ টন। এ ছাড়া অকটেনের মজুত ৩১ হাজার ৮২১ টন, পেট্রোল ১৮ হাজার ২১১ টন, ফার্নেস অয়েল ৭৭ হাজার ৫৪৬ টন এবং জেট ফুয়েল ১৮ হাজার ২২৩ টন। একই সঙ্গে বিকল্প উৎস থেকে আমদানি করা জ্বালানিবাহী একাধিক জাহাজও দেশে পৌঁছেছে।

সংকটময় এই পরিস্থিতিতে আজ রোববার থেকে বাজারে জ্বালানি তেলের সরবরাহ বাড়ানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে সরকার। বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম করপোরেশন (বিপিসি) জানিয়েছে, ভোগান্তি কমাতে এ উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। অকটেনের সরবরাহ ২০ শতাংশ, পেট্রোল ও ডিজেল ১০ শতাংশ হারে বাড়ানো হবে।

রাজধানীর মতিঝিল, মৎস্য ভবন, পরীবাগ, তেজগাঁওসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায় ভিন্ন বাস্তবতা। অনেক পাম্পে তেল সরবরাহ অনিয়মিত, কোথাও আংশিক বিক্রি, কোথাও পুরোপুরি বন্ধ। আবার কোথাও তেল আসার খবর ছড়ালেই মুহূর্তেই তৈরি হচ্ছে বিশৃঙ্খলা। তবে তেলের আশায় প্রতিটি পাম্পে গাড়ি ও মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি কোনোভাবেই ছোট হচ্ছে না।

পরীবাগের মেঘনা ফিলিং স্টেশনে সকাল থেকেই কয়েকশ গাড়ির দীর্ঘ লাইন দেখা যায়। গাড়ির সারি হাতিরপুল বাজার ছাড়িয়ে আরও দূরে চলে গেছে। লাইনে দাঁড়ানো গাড়িচালক আকবর হোসেন বলেন, ভোর ৫টা থেকে দাঁড়িয়ে আছি। দুপুর হয়ে গেল, এখনও তেল পাইনি। মৎস্য ভবন এলাকায়ও একই চিত্র। শুক্রবার রাত থেকে এখানে গাড়ির সারি। গতকাল দুপুরে সেই সারি আরও লম্বা হতে দেখা গেছে। লাইনে দাঁড়ানো গাড়িচালক খালেদ হোসেন বলেন, শুক্রবার রাত ১১টায় এসে ১৫ নম্বরে সিরিয়াল পাই। এখন দুপুর ১২টা। তেল দেওয়া শুরু হয়নি। কখন দেবে, বলতে পারছি না। পাশে দাঁড়ানো মোটরসাইকেলের চালক রঞ্জিত মল্লিক ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়েও তেল মেলে না; কিন্তু মন্ত্রী বলছেন, ইতিহাসের রেকর্ড মজুত আছে। এই তেল কই যাচ্ছে?

দেশের বিভিন্ন শহরেও একই প্রবণতা দেখা গেছে। কোথাও কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই তেল শেষ হয়ে যাচ্ছে, কোথাও সপ্তাহের বেশির ভাগ সময় পাম্প বন্ধ থাকছে।

নারায়ণগঞ্জের আড়াইহাজারে কয়েক দিন বন্ধ থাকার পর একটি ফিলিং স্টেশনে তেল সরবরাহ শুরু হলেও ভোগান্তি কমেনি। গতকাল ভোর থেকেই আলিফ লাম ফিলিং স্টেশনের সামনে শত শত মোটরসাইকেল ও গাড়ির ভিড় জমে। ফলে নরসিংদী-মদনগঞ্জ আঞ্চলিক মহাসড়কে তীব্র যানজট দেখা দেয়। পাম্পটির ব্যবস্থাপক জিয়ারত হোসেন জানান, তিন দিন পর সীমিত পরিমাণ তেল পাওয়ায় চাপ সামাল দেওয়া কঠিন হয়ে পড়েছে। তেল নিতে আসা নুরুল ইসলাম বলেন, একাধিক পাম্প ঘুরে তেল না পেয়ে কর্মজীবনে ব্যাঘাত ঘটছে।

জ্বালানি সংকটের প্রভাব পড়েছে ব্যবসায়ও। খুলনার ডুমুরিয়ায় মোটরসাইকেল ও কৃষিযন্ত্রের বিক্রি প্রায় বন্ধ। আগে যেখানে মাসে শতাধিক মোটরসাইকেল বিক্রি হতো, এখন তা নেমে এসেছে ১৫-২০টিতে। ক্রেতা কমে যাওয়ায় কিস্তি পরিশোধেও হিমশিম খাচ্ছেন অনেকে। অন্যদিকে নোয়াখালীতে ১ হাজার ৪০০ লিটার অবৈধ ডিজেলসহ চারজন আটক এবং কুড়িগ্রাম সীমান্তে জ্বালানি পাচার ঠেকানোর ঘটনা সামনে এসেছে। নওগাঁর আত্রাইয়ে ১১২ লিটার পেট্রোল জব্দ করা হয়েছে। এসব ঘটনায় সরবরাহের বাইরে তেল চলে যাওয়ার ইঙ্গিত মিলছে। রংপুরের পীরগঞ্জে লাইনে থাকা গ্রাহককে বাদ দিয়ে ড্রামে তেল বিক্রির অভিযোগ উঠেছে। একই সঙ্গে খোলাবাজারে লিটারপ্রতি ২০০ থেকে ২৫০ টাকায় অকটেন বিক্রির অভিযোগ পাওয়া গেছে।

পাম্প মালিক সমিতির সভাপতি নাজমুল হক বলেন, সরকার যে হারে তেল দিচ্ছে, তা আগের চাহিদা অনুযায়ী। কিন্তু এখন গাড়ির সংখ্যা বেড়েছে। ফলে এক দিনের তেল কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই শেষ হয়ে যাচ্ছে। অনেক পাম্প নিয়মিত তেল পাচ্ছে না।

দীর্ঘ লাইনের কারণে যানজট বাড়ছে, ব্যাহত হচ্ছে পণ্য পরিবহন। জরুরি সেবার যানবাহনও পড়ছে বিপাকে, যা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলছে। সরকারি পদক্ষেপ হিসেবে ট্যাগ অফিসার নিয়োগ, ভ্রাম্যমাণ আদালতের অভিযান এবং নিয়মিত মজুতের তথ্য প্রকাশ করা হলেও তা যথেষ্ট কার্যকর হচ্ছে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।
জ্বালানি বিশেষজ্ঞ ড. শামসুল আলম মনে করেন, ঘাটতির পাশাপাশি রয়েছে বাজার ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। এ ছাড়া মানুষের মধ্যে আস্থার সংকট তৈরি হওয়ায় তারা প্রয়োজনের চেয়ে বেশি তেল কিনছে, যা সংকটকে তীব্র করছে।

জ্বালানি বিশ্লেষক এম তামিম বলেন, সরকার মজুতের কথা বলছে; কিন্তু সেই তেল কীভাবে বাজারে পৌঁছাচ্ছে, সেটিই বড় প্রশ্ন। অবৈধ মজুত ও কালোবাজারিও পরিস্থিতিকে জটিল করে তুলেছে।

এদিকে সরকার বলছে, জ্বালানির কোনো ঘাটতি নেই; বরং আগের বছরের চেয়ে সমপরিমাণ, কোথাও কোথাও বেশি সরবরাহ করা হচ্ছে। তবে বাস্তব পরিস্থিতি ভিন্ন হওয়ায় প্রশ্ন উঠছে ব্যবস্থাপনা নিয়ে।

গত শুক্রবার বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত বলেন, দেশের ইতিহাসে বর্তমানে সবচেয়ে বেশি পরিশোধিত জ্বালানি তেলের মজুত রয়েছে। সরকার জ্বালানি সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে ধারাবাহিকভাবে কাজ করছে। ঘাটতির কোনো শঙ্কা নেই। তিনি বলেন, এপ্রিল ও মে মাসের জন্য প্রয়োজনীয় জ্বালানির পূর্ণ মজুত রয়েছে। সমকাল




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD