বৃহস্পতিবার, ৩০ এপ্রিল ২০২৬, ১২:৪২ অপরাহ্ন




প্রশান্তির মাটির ঘরে থাকা খুবই আরামদায়ক

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: বুধবার, ৩১ মে, ২০২৩ ৯:০১ pm
CLAY HOUSE BANGLADESH Matir Ghor মাটির ঘর মাটির বাড়ি মাটির ঘর Matir bari Matir ghor
file pic

আধুনিকতার ছোঁয়ায় বিলুপ্তির পথে সিরাজগঞ্জের মাটির ঘর। শীত-গ্রীষ্ম সব ঋতুতেই মাটির ঘর আরামদায়ক বাসস্থান। অতীতে এই এলাকার অধিকাংশ মানুষই মাটির ঘরে বসবাস করতো। অবস্থা সম্পন্ন মানুষ মাটির দোতালা ঘর বানাতেন। সিরাজগঞ্জ জেলার চলনবিল এলাকার তাড়াশ ও রায়গঞ্জ উপজেলার পশ্চিম এলাকার প্রায় প্রতিটি গ্রামেই এখনো কিছু কিছু মাটির তৈরি ঘর দেখা যায়। যার জানালা-দরজা কাঠের হলেও টালি অথবা খড়ের চালের বসতঘর। এক সময় এই এলাকার ধনী-গরিব সবাই সেই ঘরে বসবাস করতেন। তবে কালের বিবর্তনে আর আধুনিকতার ছোঁয়ায় বিলুপ্ত হতে বসেছে মাটি দিয়ে তৈরি ঘর।

স্থানীয়রা বলছেন, তাড়াশের ৮ ইউনিয়নে ২৪৮টি গ্রামের মধ্যে দেশীগ্রাম ইউনিয়নের আড়ঙ্গাইল গ্রামে পাশাপাশি ২টি পরিবারে শত বছরের পুরনো ৩টি মাটির দেয়ালের খড়ের চালের বসতঘর এখনো রয়েছে। এই মাটির ঘরে আজও সালাম মণ্ডল (৬০) ও রফিক (৬২)। স্ত্রী, সন্তান, নাতী-নাতনী নিয়ে একসঙ্গে বসবাস করছে।

এ ব্যাপারে সালাম মণ্ডল ও রফিক জানান, আরামদায়ক মাটির ঘরে দরিদ্র মানুষের পাশাপাশি বিত্তবানরাও একসময় পরিবার-পরিজন নিয়ে বসবাস করতেন। এই ঘরে শীতকালে যেমন গরম অনুভব হয়, তেমনি গ্রীষ্মকালে থাকে ঠাণ্ডা শীতল অনুভূতি। এঁটেল ও দো-আঁশ মাটি দিয়ে কম খরচে খুব সহজেই তৈরি করা হয়েছে এই ঘর। মাটির দেয়াল তৈরি সম্পূর্ণ হলে তার ওপর খড়ের ছাউনি অথবা মাটির তৈরি টালি ছাউনি দেওয়া হয়েছে। বৃষ্টি বা বন্যায় ক্ষতিগ্রস্ত না হলে এসব ঘর অনেক বছর পর্যন্ত টিকে থাকে বলেও জানান তারা।

রায়গঞ্জ উপজেলার সোনাখাড়া ইউনিয়ন পরিষদের মৌহার গ্রামের নূরুল ইসলাম বলেন, ‘প্রায় ৬০ বছর আগে এই ঘর নির্মাণ করেছিলাম। তখন আমার খরচ হয়েছিল প্রায় ছয় হাজার টাকা। আমাদের এই এলাকায় মাটির ঘর অনেক রয়েছে। এখন এই ধরনের ঘর তৈরি করতে প্রায় পঁচিশ ত্রিশ হাজার টাকার বেশি খরচ হয়। এই ঘরে থেকে অনেক শান্তি গরমের মধ্যে বেশি গরম লাগে না। এছাড়া, এই ধরনের ঘরে চোরের ওপদ্রব ও অনেকটাই কম।

একই এলাকার আবু হেনা মো. মোস্তফা কামাল রিপন জানান, ‘রায়গঞ্জ ও তাড়াশ উপজেলায় আজও অনেক মাটির ঘর রয়েছেন। নিম্ন ও মধ্যবিত্ত পরিবারের সদস্যরা বাপ-দাদার তৈরি করা মাটির ঘর প্রতিবছর কিছুটা মাটি দিয়ে সংস্কার করে আজও বসবাস করছেন।’

এদিকে নরসিংদীর বেলাব উপজেলার হাড়িসাংগান গ্রামের ‘প্রফেসর হাউজ’ নামের বাড়িতে দেখা মিলবে চারটি মাটির ঘর। এগুলোর বয়স প্রায় ১৫০ বছর। ইটের প্রাচীরওয়ালা বাড়ির ভেতরে মাটির ঘরগুলো যেন ছবির মতো।

ঘরগুলোর একটিতে রয়েছে অতিথিদের থাকার ব্যবস্থা। আরেকটি ঘর লেখাপড়ার জন্য। বাকি দুটি পারিবারিক কাজে ব্যবহার হয়।

মাটির ঘর নিয়ে কথা হয় হারিসাংগান গ্রামের ৬৫ বছর বয়সী ছিদ্দিকুর রহমান ছিদ্দিকের সঙ্গে। তিনি বলেন, ‘ইট-পাথরের তৈরি বিল্ডিংয়ের মেয়াদ আছে, তবে আমাদের মাটির ঘরের কোনো মেয়াদ নাই।’

তিনি বলেন, ‘গরমের সময় গরম লাগে না। শীতের সময় শীত লাগে না। মাটির ঘরে থাকা খুবই আরামদায়ক। টিনের চাল দিয়ে দুই কক্ষবিশিষ্ট একটি মাটির ঘর নির্মাণের খরচ দেড় লক্ষ টাকা ছাড়িয়ে যায়।’

হারিসাংগান গ্রামের ৫৫ বছর বয়সী মাটির ঘর নির্মাণশ্রমিক সিরাজ মিয়া বলেন, ‘আমরা যেসব মাটির ঘর নির্মাণ করেছি, তা ইটের ঘরের চেয়ে পাকাপোক্ত। এই ঘরগুলো ভূমিকম্প হলেও ভেঙে পড়ে না।’

তিনি আরও বলেন, ‘আমাদের বাপ-দাদার জন্মের আগ থেকেই মাটির ঘরের প্রচলন ছিল এই গ্রামে। জমি থেকে এঁটেল মাটি সংগ্রহ করে, সিমেন্ট যেভাবে গুলিয়ে নেয়া হয়, ঠিক সেভাবে মাটিগুলো কাদায় পরিণত করা হয়।

‘প্রথমে নিচের অংশে তিন ফুট চওড়া করে দুই ফুট চওড়া দেয়াল তৈরি করা হয়। ১২ ফুট উঁচু দেয়ালে কাঠ বা বাঁশের সিলিং তৈরি করা হয়। তার ওপর টিনের ছাউনি দেয়া হয়। মাটির ঘর তৈরি করতে কারিগরদের তিন-চার মাসের বেশি সময় লাগে। এ ছাড়া কিছু স্থানে দোতলা পর্যন্ত মাটির ঘর নির্মাণ করেছি আমরা।’

ঘরগুলোর মালিক অবসরপ্রাপ্ত অধ্যাপক মো. নজরুল ইসলাম বলেন, ‘হাড়িসাংগান গ্রাম বাংলাদেশের মাঝে একটি ঐতিহ্যবাহী গ্রাম। এই গ্রামে একটি উচ্চ মাধ্যমিক বিদ্যালয় আছে, যা লেখাপড়ায় বছরের বছর ধরে শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রেখেছে।’

মাটির ঘরের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমাদের মাটির ঘর গরিবের শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত ঘর বলে পরিচিত। এ ঘর শীত ও গরম মৌসুমে আরামদায়ক। তাই আরামের জন্য গ্রামের দরিদ্র মানুষের পাশাপাশি অনেক বিত্তবান মানুষ মাটির ঘর তৈরি করে থাকছেন হাড়িসাংগান গ্রামসহ অন্যান্য গ্রামে।’




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD