যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরাইলের সঙ্গে চলমান যুদ্ধের ইতি টানতে পাঁচটি কঠোর শর্ত দিয়েছে ইরান। সোমবার হিব্রু সংবাদমাধ্যমের বরাতে এই তথ্য জানা গেছে। গত ফেব্রুয়ারি মাসের শেষদিক থেকে শুরু হওয়া এই সংঘাত বন্ধে একটি চুক্তিতে পৌঁছাতে তেহরান এই শর্তগুলো নির্ধারণ করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।
ইসরাইলি সংবাদমাধ্যম চ্যানেল ১২-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডনাল্ড ট্রাম্পের ঘোষিত পরোক্ষ আলোচনার অংশ হিসেবে ইরান তাদের আনুষ্ঠানিক দাবিগুলো তুলে ধরেছে।
চলমান সংঘাত নিরসনে স্থায়ী যুদ্ধবিরতি চায় তেহরান। ভবিষ্যতে আর হামলা না করার পুরোপুরি আনুষ্ঠানিক নিশ্চয়তা চেয়েছে দেশটি। কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালির জন্য একটি নতুন ব্যবস্থার দাবি জানানো হয়েছে, যার মাধ্যমে এর নিয়ন্ত্রণ কার্যত ইরানের হাতে থাকবে। শর্তের মধ্যে মধ্যপ্রাচ্য থেকে মার্কিন সরানোর কথাও রয়েছে। এছাড়া এই যুদ্ধে আর্থিকভাবে যে ক্ষতি হয়েছে সেই বিপুল অর্থ পরিশোধ করতে হবে। শেষ শর্তটি হচ্ছে- যুদ্ধের পুনরাবৃত্তি রোধে নির্দিষ্ট গ্যারান্টি প্রদান।
একই দিনে টেনেসিতে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প জানান, ওয়াশিংটন দীর্ঘ সময় ধরে ইরানের সঙ্গে আলোচনা চালিয়ে যাচ্ছে এবং এবার তারা (ইরান) বেশ গুরুত্ব দিচ্ছে। তিনি আরও বলেন, আমাদের সামরিক বাহিনীর অসামান্য পারফরম্যান্সের কারণেই এটি সম্ভব হয়েছে। আমরা আশা করি একটি চুক্তিতে পৌঁছানো যাবে। তবে যাই ঘটুক না কেন, আমরা নিশ্চিত করব যেন ইরান কখনোই পারমাণবিক অস্ত্র হাতে না পায়।
ইরানকে সতর্ক করে ট্রাম্প বলেন, আমেরিকা এবং আমাদের মিত্রদের জন্য হুমকি বন্ধ করার এটিই ইরানের শেষ সুযোগ। যেভাবেই হোক, আমরা আমেরিকাসহ পুরো বিশ্বকে আরও নিরাপদ এবং স্থিতিশীল করব।
সূত্র: মিডল ইস্ট মনিটর।
মধ্যপ্রাচ্যের চলমান সংঘাত নিরসনে ইরানের কাছে ১৫ দফার একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের গণমাধ্যমগুলো জানাচ্ছে যে, ওয়াশিংটন যুদ্ধ শেষ করার জন্য ইরানের কাছে এই পরিকল্পনা পাঠিয়েছে। আল জাজিরা
ওয়াল স্ট্রিট জার্নালের খবর, এই পরিকল্পনায় ইরানকে তার তিনটি প্রধান পারমাণবিক স্থাপনা ভেঙে ফেলতে এবং যেকোনো ধরনের ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ বন্ধ করতে বলা হয়েছে। এতে তেহরানকে তার ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচি স্থগিত করতে, প্রক্সিদের প্রতি সমর্থন কমাতে এবং হরমুজ প্রণালী সম্পূর্ণরূপে পুনরায় খুলে দিতেও আহ্বান জানানো হয়েছে।
সংবাদমাধ্যমটি নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক কর্মকর্তাদের উদ্ধৃতি দিয়ে আরও জানায়, এর বিনিময়ে ইরানের ওপর থেকে পারমাণবিক নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়া হবে এবং যুক্তরাষ্ট্র দেশটির বেসামরিক পারমাণবিক কর্মসূচিতে সহায়তা করবে।
এদিকে, কূটনৈতিক সূত্রের বরাত দিয়ে দ্য নিউইয়র্ক টাইমস জানিয়েছে, পরিকল্পনাটি পাকিস্তানের মাধ্যমে পাঠানো হয়েছে এবং এতে ইরানের পারমাণবিক ও ব্যালিস্টিক ক্ষেপণাস্ত্র কর্মসূচির পাশাপাশি হরমুজ প্রণালীর বিষয়টিও অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
এতে বলা হয়েছে, পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল সৈয়দ আসিম মুনির যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে মূল মধ্যস্থতাকারী হিসেবে আবির্ভূত হয়েছেন। ইসলামাবাদ উভয়পক্ষ রাজি হলে সরাসরি আলোচনার আয়োজন করতে প্রস্তুত বলেও ইঙ্গিত দিয়েছে।
ইসরায়েলের চ্যানেল ১২ তিনটি সূত্রের বরাত দিয়ে জানিয়েছে, ১৫-দফা পরিকল্পনা নিয়ে আলোচনার জন্য যুক্তরাষ্ট্র এক মাসব্যাপী যুদ্ধবিরতি চাইছে। এতে বলা হয়, এই পরিকল্পনার মধ্যে ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচি ভেঙে দেয়া, প্রক্সি গোষ্ঠীগুলোকে সমর্থন বন্ধ করা এবং হরমুজ প্রণালী পুনরায় খুলে দেয়ার বিষয়গুলো অন্তর্ভুক্ত থাকবে।
বার্তা সংস্থা রয়টার্স জানিয়েছে, বিষয়টি সম্পর্কে অবগত একটি সূত্র নিশ্চিত করেছে যে যুক্তরাষ্ট্র ইরানের কাছে একটি পরিকল্পনা পাঠিয়েছে। যদিও এই পরিকল্পনা নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র বা ইরানের পক্ষ থেকে কোনো আনুষ্ঠানিক মন্তব্য করা হয়নি।
সম্প্রতি মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, তেহরানের সঙ্গে “খুব ভালো ও ফলপ্রসূ” আলোচনা হয়েছে। তিনি ইরানের জ্বালানি অবকাঠামোর ওপর হামলা পাঁচ দিনের জন্য স্থগিত রাখার ঘোষণাও দেন।
তবে ইরান সরাসরি এই দাবি অস্বীকার করেছে। তেহরানের কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, তারা “বন্ধুত্বপূর্ণ দেশগুলোর” মাধ্যমে বার্তা পেলেও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে কোনো সরাসরি আলোচনা হয়নি।
এদিকে, ২৮ ফেব্রুয়ারি থেকে শুরু হওয়া যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল-এর হামলা এবং ইরানের পাল্টা আক্রমণের মধ্য দিয়ে সংঘাত এখন চতুর্থ সপ্তাহে গড়িয়েছে। বিমান হামলা, ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র পাল্টাপাল্টি ব্যবহারে বহু হতাহতের ঘটনা ঘটেছে, অবকাঠামোর ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে, বৈশ্বিক তেলের বাজার ও বিমান চলাচলে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে।
বিশ্লেষকদের মতে, ১৫ দফার এই প্রস্তাব সংঘাত নিরসনের একটি সম্ভাব্য কূটনৈতিক পথ খুলে দিলেও, তা বাস্তবায়ন নির্ভর করছে ইরানের সম্মতি, ইসরায়েলের অবস্থান এবং চলমান সামরিক পরিস্থিতির ওপর। সব মিলিয়ে, যুদ্ধের মাঝেই কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়লেও, সমাধান এখনও অনিশ্চিতই রয়ে গেছে।