‘অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন ও বিনিয়ন্ত্রণকরণ : ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির অভিযাত্রায় বাংলাদেশ’ সম্ভাব্য শিরোনামে জাতীয় বাজেট দিতে যাচ্ছে বর্তমান সরকার। ১১ জুন জাতীয় সংসদে অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী এ বাজেট উপস্থাপন করবেন। অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতার বই আগামী দু-একদিনের মধ্যে বিজি প্রেসে ছাপা শুরু হবে। এ কারণে শেষ মুহূর্তে পাণ্ডুলিপির ঘষামাজার কাজ চলছে।
সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, জাতীয় বাজেটের শিরোনাম কি হবে তা নিয়ে বিচার-বিশ্লেষণ চলছে। অর্থমন্ত্রীর টেবিলে আরও পাঁচটি শিরোনাম এসেছে। এগুলো হলো-‘অর্থনৈতিক বিনিয়ন্ত্রণকরণ, সবার জন্য উন্নয়ন’, ‘অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন ও বিনিয়ন্ত্রণকরণ সবার জন্য উন্নয়ন’, ‘মানবিক কল্যাণমূলক ও উৎপাদনমুখী দেশ কর্মসংস্থান সুশাসন ও সমতায় সমৃদ্ধ বাংলাদেশ’, ‘বৈষম্যহীন টেকসই ও ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতি গড়ার প্রত্যয়’ এবং ‘অর্থনৈতিক পুনর্গঠন : ক্রিয়েটিভ অর্থনীতির নতুন বাংলাদেশ’। এর মধ্যে একটি শিরোনাম বাজেট বক্তৃতার বইয়ে স্থান পাবে। এছাড়া বাজেট সংক্রান্ত অন্য বইগুলো ছাপা শেষ হয়েছে। বাজেটের দর্শন হিসাবে ‘অর্থনৈতিক গণতন্ত্রায়ন’ শব্দটির বিশেষ তাৎপর্য রয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধা সীমিত কয়েকটি গোষ্ঠীর মধ্যে কেন্দ্রীভূত না রেখে বৃহত্তর জনগোষ্ঠীর মধ্যে ছড়িয়ে দেওয়ার লক্ষ্য থেকে এ ধারণাকে সামনে আনা হয়েছে।
একই সঙ্গে ‘বিনিয়ন্ত্রণকরণ’ বা ডিরেগুলেশনকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। ব্যবসা শুরু, লাইসেন্স গ্রহণ, আমদানি-রপ্তানি এবং শিল্প স্থাপনের ক্ষেত্রে দীর্ঘসূত্রতা কমিয়ে আনার উদ্যোগ নেওয়া হতে পারে। প্রশাসনিক জটিলতা কমানো গেলে দেশি-বিদেশি বিনিয়োগ উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়বে বলে আশা করা হচ্ছে।
এ প্রসঙ্গে সাবেক অর্থ সচিব মাহবুব আহমেদ বলেন, নতুন সরকারের জন্য এটি একটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ বাজেট। তিনি বলেন, অর্থনীতি বর্তমানে পুনরুদ্ধারের পর্যায়ে রয়েছে। তাই বাজেটকে অবশ্যই বাস্তবসম্মত হতে হবে। উচ্চাভিলাষী লক্ষ্য নির্ধারণ করা ভালো, কিন্তু রাজস্ব আহরণ, বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বাস্তব সক্ষমতাকে বিবেচনায় নিতে হবে।
তিনি আরও বলেন, বৈদেশিক ঋণ নেওয়া কোনো সমস্যা নয়, যদি সেই অর্থ উৎপাদনশীল খাতে ব্যবহৃত হয় এবং ভবিষ্যতে অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি বাড়াতে সহায়তা করে। তবে ঋণ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
মূল্যস্ফীতি কমিয়ে দ্রব্যমূল্য সাধারণ মানুষের নাগালের মধ্যে নিয়ে আসা সরকারের জন্য একটি বড় চ্যালেঞ্জ। সর্বশেষ মে মাসে পয়েন্ট টু পয়েন্ট ভিত্তিতে মূল্যস্ফীতি দাঁড়িয়েছে ৯ দশমিক ৪২ শতাংশ। এ ধারা অব্যাহত থাকলে বছর শেষে লক্ষ্যমাত্রা অনুযায়ী মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনা অনেক কঠিন হবে বলে মনে করছেন অর্থনীতিবিদরা।
বেসরকারি গবেষণা সংস্থা সিপিডির নির্বাহী পরিচালক ফাহমিদা খাতুন বলেন, নতুন সরকারের সামনে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে রাজস্ব আহরণ এবং মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণ করা। তিনি আরও বলেন, প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য অর্জনের জন্য বিনিয়োগ বাড়াতে হবে, আর বিনিয়োগ বাড়াতে হলে ব্যবসায়িক আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে। একই সঙ্গে ব্যাংকিং খাতের সংস্কার, আর্থিক খাতে সুশাসন এবং নীতি-স্থিতিশীলতা নিশ্চিত করা জরুরি।
তিনি বলেন, ট্রিলিয়ন ডলার অর্থনীতির লক্ষ্য অবশ্যই ইতিবাচক ও অনুপ্রেরণাদায়ক। কিন্তু সেই লক্ষ্য অর্জনের জন্য মানবসম্পদ উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, প্রযুক্তি এবং উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধিতে দীর্ঘমেয়াদি বিনিয়োগ প্রয়োজন। শুধু বাজেটের আকার বড় হলেই হবে না, ব্যয়ের গুণগত মানও নিশ্চিত করতে হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, এবারের বাজেটের মূল লক্ষ্য হবে- অর্থনীতিতে বেসরকারি খাতের অংশগ্রহণ বাড়ানো, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থান সম্প্রসারণ, ব্যবসা সহজীকরণ, রপ্তানি বহুমুখীকরণ এবং দীর্ঘমেয়াদে বাংলাদেশকে ট্রিলিয়ন ডলারের অর্থনীতিতে রূপান্তরের ভিত্তি তৈরি করা। আসন্ন ২০২৬-২৭ অর্থবছরের প্রস্তাবিত বাজেটের আকার ৯ লাখ ৩৮ হাজার কোটি টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। এর মধ্যে রাজস্ব আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ৬ লাখ ৯৫ হাজার কোটি টাকা। ফলে মোট বাজেটে ঘাটতির পরিমাণ দাঁড়াচ্ছে ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকা। অর্থনীতির আকার বা জিডিপি নির্ধারণ করা হয়েছে ৬৮ লাখ ৩০ হাজার ২৪ কোটি টাকা। আগামী অর্থবছরে জিডিপি প্রবৃদ্ধি ৬ দশমিক ৫ শতাংশ এবং মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৫ শতাংশে নামিয়ে আনার লক্ষ্য নির্ধারণ করেছে সরকার।
অর্থ মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, গত কয়েক বছরে অর্থনীতির প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল উচ্চ মূল্যস্ফীতি, বেসরকারি বিনিয়োগের স্থবিরতা এবং কর্মসংস্থানের ধীরগতি। নতুন বাজেটে তাই উৎপাদন, বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। বিশেষ করে শিল্প, কৃষি, রপ্তানি, প্রবাসী আয় এবং অবকাঠামো খাতে নীতিগত সহায়তা অব্যাহত থাকবে। তবে বাজেটের সবচেয়ে আলোচিত বিষয় হয়ে উঠেছে ঘাটতি অর্থায়নের কাঠামো। মোট ২ লাখ ৪৩ হাজার কোটি টাকার ঘাটতির মধ্যে বৈদেশিক উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার লক্ষ্যমাত্রা ধরা হয়েছে ১ লাখ ৫৭ হাজার কোটি টাকা। একই সময়ে বৈদেশিক ঋণের আসল ও সুদ বাবদ পরিশোধ করা হবে প্রায় ৪৬ হাজার কোটি টাকা। ফলে নিট বৈদেশিক ঋণের পরিমাণ দাঁড়াবে ১ লাখ ১৬ হাজার কোটি টাকা।
অন্যদিকে অভ্যন্তরীণ উৎস থেকে ঋণ নেওয়ার পরিকল্পনা রয়েছে ১ লাখ ২৭ হাজার কোটি টাকা। এর মধ্যে ব্যাংক ব্যবস্থা থেকে ১ লাখ ১২ হাজার সঞ্চয়পত্র এবং অন্যান্য উৎস থেকে ১৫ হাজার কোটি টাকার অর্থ সংগ্রহ করা হবে। পরিচালনসহ অন্যান্য ব্যয় খাতের জন্য ৬ লাখ ৩০ হাজার কোটি টাকার বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এছাড়া বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ইতোমধ্যে ৩ লাখ কোটি টাকা বরাদ্দের অনুমোদন দিয়েছে সরকার।
(যুগান্তর)