শুক্রবার, ০১ মে ২০২৬, ০১:৩০ অপরাহ্ন




১৪ জুন বিশ্ব রক্তদাতা দিবস

জীবন বাঁচাতে রক্তের বিকল্প নেই

ডা. সাজেদুল ইসলাম নাহিম
  • প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ১৩ জুন, ২০২৩ ৯:২০ pm
blood আইসিইউ রক্ত দান blood donation Cells Plasma Circulation circulating fluid nutrition oxygen রক্ত দান হিমোগ্লোবিন রক্তশূন্যতা হৃৎপিণ্ড ধমনী শিরা তরল যোজক কলা অক্সিজেন কার্বন ডাই অক্সাইড
file pic

২০০৪ সালে দিবসটি প্রথম পালিত হয়েছিল। নিরাপদ রক্ত নিশ্চিত করা ও স্বেচ্ছা রক্তদাতাদের উৎসাহ দিতেই বিশ্বব্যাপী পালিত হয়ে আসছে দিবসটি। সারা বিশ্বের মতো বাংলাদেশেও নানা কর্মসূচির মধ্য দিয়ে পালিত হবে দিবসটি। দেশে রক্তের চাহিদা পূরণে স্বেচ্ছা রক্তদাতাদের প্রতি আহ্বান জানিয়ে থাকছে নানা কর্মসূচি। এবার দিবসটির প্রতিপাদ্য নির্ধারিত হয়েছে ‘গিভ ব্লাড গিভ প্লাজমা শেয়ার লাইফ শেয়ার অফেন’। আন্তর্জাতিকভাবে এ বছর বিশ্ব রক্তদাতা দিবসের বিশ্বব্যাপী অনুষ্ঠানের আয়োজক দেশ আলজেরিয়া।

প্রসঙ্গত, প্রতিবছর বাংলাদেশ প্রায় ৮-১০ লাখ ব্যাগ রক্ত চাহিদা রয়েছে। এর একটা বড় অংশ পূরণ করে কোয়ান্টাম ফাউন্ডশন ,সন্ধানী , রেডক্রিসেন্টসহ বেসরকারি সংস্থা। এরমধ্যে ২০০০ সালে প্রতিষ্ঠার পর থেকে দুই দশকের যাত্রায় কোয়ান্টাম গড়েছে ৪ লক্ষ ৭৪ হাজার স্বেচ্ছা রক্তদাতার সুসংগঠিত ডোনার পুল। আর জীবন বাঁচানোর জন্যে এ পর্যন্ত সরবরাহ করেছে ১৫ লক্ষাধিক ইউনিট রক্ত ও রক্ত উপাদান।মোরা একটি ফুলকে বাঁচাবো বলে যূদ্ধ করি, মোরা একটি মুখের হাসির জন্য অস্ত্র ধরি। গোবিন্দ হালদারের লেখা ও আপেল মাহমুদের সুরের একটি বিখ্যাত গানের কথা। বাঙালি বীরের জাতি সেটার অনেক প্রমাণ আছে। ভাষা আন্দোলন, মুক্তিযুদ্ধ প্রমাণ করেছে সে লড়তে জানে।

অন্যায়ের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানাতে বুকের রক্ত দিতে পারে। জীবনের জন্য প্রয়োজন রক্তের। রক্তের সংকট সাধারণত যারা ভোগেন তারা আমাদেরই স্বজন, ভাই বোন। প্রতিদিন আমাদের যে পরিমাণ রক্তের প্রয়োজন সেটা পর্যাপ্ত পাওয়া যায়না।হাসপাতালের অপারেশন থিয়েটার বা স্বোচ্ছায়ক্তেদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলোতে গেলে দেখা যায় রক্তের জন্য হাহাকার। হয়তো চব্বিশ ঘণ্টায় প্রয়োজন দুইশ ব্যাগের, সরবরাহ আছে একশ পঞ্চাশ ব্যাগের। অর্থাৎ আরও পঞ্চাশ জন রক্ত পাবেন না।

অপারেশন ছাড়াও থেলাসামিয়া রোগসহ বিভিন্ন কারণে শরীরে রক্তের ঘাটতি হতে পারে। এসময় প্রয়োজন বিশুদ্ধ রক্ত। আর প্রয়োজনীয় রক্ত না পাওয়া মানে মৃত্যু ঝুঁকি। অবাক করা বিষয় ১৬ থেকে ১৮ কোটি মানুষের আমাদের দেশে একসময় বেশিরভাগ রক্তই আসতো পেশাদার রক্ত বিক্রেতা ও আত্মীয়স্বজনের কাছ থেকে। তবে এখন স্বেচ্ছা রক্তদান প্রতষ্ঠান থেকেই বেশির ভাগ রক্ত আসে। তারপর ও ঘাটতি অনেক বেশি। আর পেশাদার রক্ত বিক্রেতাদের অধিকাংশই সিফিলিস, হেপাটাইটিস-বি বা এইডসসহ নানা রোগে আক্রান্ত। ফলে এই দূষিত রক্ত পরিসঞ্চালিত হয়ে রক্তগ্রহীতা আক্রান্ত হন দুরারোগ্য ব্যাধিতে। প্রয়োজনের সময়ে রক্ত পাওয়া এবং দূষিত রক্তের অভিশাপ থেকে মুমূর্ষু মানুষকে রক্ষা করার জন্যেই প্রয়োজন নিরাপদ ও সুস্থ রক্তের।

এর জন্য প্রয়োজন সচেতন তরুণ সমাজকে এগিয়ে আসা। কারণ স্বেচ্ছা রক্তদানের মাধ্যমে যেকোনো সুস্থ মানুষ নিজের কেনো ক্ষতি না করেই একজন মুমূর্ষু মানুষকে বাঁচাতে পারে।

আমাদের দেশে বছরে প্রায় ৮থেকে থেকে১০ লক্ষ ব্যাগ রক্তের প্রয়োজন হয়। এ রক্তের অভাবে অনেক ক্ষেত্রে মুমূর্ষু রোগীর চিকিৎসা শুরু করা যায় না। কিডনী জটিলতায় আক্রান্ত রোগীর ডায়ালিসিস করার পরও রক্তের অভাবে দুশ্চিন্তায় ভোগেন ভুক্তভোগী রোগীর পরিবার। অসহনীয় শারিরীক যন্ত্রণা সহ্য করে অপেক্ষা করতে থাকেন একব্যাগ রক্তের জন্য। যখনই খবর পান রক্ত পাওয়া গেছে তখন প্রাণ ভরে তার জন্য দোয়া করেন। স্বেচ্ছা রক্তদাতারা হলেন মানুষের জীবন বাঁচানোর আন্দোলনের দূত। ভালো কাজে মানুষ সবসময় অন্যকে দেখে উদ্বুদ্ধ হয়। বন্ধু রক্ত দিচ্ছে দেখে তার আরো বন্ধুও রক্ত দিতে উদ্বুদ্ধ হয়।

রক্তদান একটি মানবিক দায়বদ্ধতা, সামাজিক অঙ্গীকার। যিনি যে পেশায়ই থাকুন না কেন, সমাজের জন্যে তার কিছু না কিছু করার আছে। এক ব্যাগ রক্তদানের মাধ্যমেও তিনি পালন করতে পারেন তার সামাজিক অঙ্গীকার।

একবার অন্তত ভাবুন, আপনার রক্তে বেঁচে উঠছে একটি অসহায় শিশু, একজন মৃত্যুপথযাত্রী মানুষ। সে মুহূর্তে আপনার যে মানসিক তৃপ্তি তাকে কখনোই অন্য কোনোকিছুর সঙ্গে তুলনা করা সম্ভব নয়।

রক্তদান স্বাস্থ্যের জন্যে অত্যন্ত উপকারী। রক্তদান করার সাথে সাথে আমাদের শরীরের মধ্যে অবস্থিত ‘বোন ম্যারো’ নতুন কণিকা তৈরির জন্যে উদ্দীপ্ত হয়। দান করার ২ সপ্তাহের মধ্যেই নতুন রক্ত কণিকা জন্ম হয়ে এই ঘাটতি পূরণ করে।

আর প্রাকৃতিক নিয়মেই যেহেতু প্রতি ৪ মাস পর পর আমাদের শরীরের রেড সেল বদলায়, তাই বছরে ৩ বার রক্ত দিলে শরীরের লোহিত কণিকাগুলোর প্রাণবন্ততা আরো বেড়ে যায়।

ইংল্যান্ডে মেডিকেল পরিসংখ্যানে দেখা গেছে, নিয়মিত স্বেচ্ছা রক্তদাতারা দুরারোগ্য রোগ-ব্যাধি থেকে প্রায়ই মুক্ত থাকেন। রক্তদাতার হৃদরোগ ও হার্ট এটাকের ঝুঁকিও অনেক কম। রক্তদান ধর্মীয় দিক থেকেও অত্যন্ত পুণ্য বা সওয়াবের কাজ। এটি এমন একটি দান যার তাৎপর্য সম্পর্কে পবিত্র কোরআনের সূরা মায়েদার ৩২নং আয়াতে বলা হয়েছে, ‘একজন মানুষের জীবন রক্ষা করা সমগ্র মানবজাতির জীবন রক্ষা করার মতো মহান কাজ।’

ঋগ্‌বেদে বলা হয়েছে ‘নিঃশর্ত দানের জন্যে রয়েছে চমৎকার পুরস্কার। তারা লাভ করে আশীর্বাদধন্য দীর্ঘজীবন ও অমরত্ব।’ আসলে সব ধর্মেই রক্তদানকে উৎসাহিত করা হয়েছে। নিঃসন্দেহে এটি একটি বড় ইবাদত।

অনেকে নানা অজুহাতে রক্ত দিতে চাই না। কারো সুঁইয়ের ভয়, কেউ অসুস্থ বা দুর্বল হওয়ার ভয়। কেউ ভাবেন, রক্ত দিলে হয়তো শারীরিকভাবে অসুস্থ হয়ে পড়বে, দুর্বলতায় ভুগবে বা বড় কোনো ক্ষতি হবে তার। তাছাড়া অনেকে ভাবেন, রক্ত যদি দিতেই হয় তো সেটা যেন পরিবারের সদস্য, নিকটাত্মীয় বা বন্ধুর জরুরি প্রয়োজনে দেয়া হয়, বাহিরের মানুষকে নয়। এখন বাস্তবতা হচ্ছে, রক্ত দেয়া হোক বা না হোক, নির্দিষ্ট একটা সময়ের ব্যবধানে তা এমনিই বদলে যায়। যেমন, রক্তের প্রধান তিন উপাদানের একটি- অনুচক্রিকার আয়ু ৮-৯ দিন, শ্বেতকণিকার আয়ু ১৩-২০ দিন এবং লোহিত কণিকার আয়ু ১২০ দিন। নির্দিষ্ট এ সময় পর কণিকাগুলো নিজে নিজেই লিম্ফিটিক সিস্টেমের ভেতরে ধ্বংস হয়ে যায়।

রক্তদানের মাধ্যমে রক্তদাতার বরং উপকার হয়। রক্ত দেওয়ার সময় তার অনেকগুলো টেস্ট করা হয়। তার একটা ফ্রি মেডিকেল চেকআপ হয়ে যায়। যতবার রক্ত দেবে ততবার ফ্রি মেডিকেল চেকআপ হয়ে যায়। রক্ত দেওয়ার আগে তার পালস দেখা হয়, ব্লাড পেশার দেখা হয় এবং রক্তের অনেকগুলো টেস্ট করা হয়। এর মাধ্যমে যদি তার কোনো অসুস্থতা থাকে সেটা সে জানতে পারে এবং সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা নিতে পারে। এটা তার একটা বাড়তি লাভ।

এছাড়া যারা নিয়মিত রক্তদান করেন তাদের হার্ট ডিজিস কম হয়। যেমন হার্টের এরিথমিয়া, হার্ট অ্যাটাক এগুলো কমে যায়। কারণ রক্তদানের মাধ্যমে শরীর থেকে অতিরিক্ত আয়রন চলে যায়। অতিরিক্ত আয়রনের জন্যে হার্টের ওপর একটা এফেক্ট পরে। এছাড়া রক্তে মাত্রাতিরিক্ত লৌহ শরীরের ব্লাড ভ্যাসেল স্ট্রিক্ট করে, এ থেকে তার স্ট্রোক হতে পারে। নিয়মিত রক্তদান করলে স্ট্রোকের আশংকা ৮৮% কমে যায়। এছাড়া রক্ত দেওয়ার মাধ্যমে ওবেসিটির পেসেন্টরাও উপকৃত হতে পারেন।

এছাড়া দেখা যাচ্ছে রক্তে যদি আয়রনের পরিমাণ বেশি থাকে সেগুলো লিভারে জমা হয়। যা পরবর্তীতে হেমোক্রোমাটোসিস সৃষ্টি করে। এখান থেকে লিভার সিরোসিস হয়। এমনকি ক্যান্সারও হতে পারে। অতএব রক্তদান করলে অনেকের ক্যান্সার ঝুঁকি কমে যায়। যিনি রক্ত দিচ্ছেন তার শরীরে ৬০- ১২০ দিনের মধ্যে রক্ত পূরণ হয়ে যায়।

অর্থাৎ আমরা দাতা ছিলাম, এক মহান জাতি ছিলাম, আমাদের এক মহান ইতিহাস ছিল। ফলে সমৃদ্ধ অর্থনীতির সাথে সাথে আমরা উন্নত মানবিক সম্পন্ন সুস্থ মানুষ হিসেবে পরিচয় অর্জন করবো। মনে রাখতে হবে, দাতা কখনো গরীব হতে পারে না।

লেখক: ডা. সাজেদুল ইসলাম নাহিম, এমবিবিএস (ইউএসটিসি), সিসিডি (বারডেম), পিজিটি (মেডিসিন)।




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD