মাটির কাজে যেখানে খরচ হওয়ার কথা ২ লাখ ৯ হাজার টাকা, সেখানে বরাদ্দ দেওয়া হয় ১৭ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। বরাদ্দকৃত টাকা পেয়ে প্রকল্প বাস্তবায়ন কমিটির (পিআইসি) সদস্যদের সঙ্গে কর্মকর্তাদের অর্থ ভাগাভাগিই হয়ে ওঠে মুখ্য। যারা মনিটরিং করেন ভাগ পান তারাও। কৃষকের স্বপ্ন নিয়ে তাদের মাথাব্যথা কমই। বৈশাখের শুরুতে ফসলের মাঠে বৃষ্টির পানিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়ে তলিয়ে যায় হাজার হাজার একর জমির পাকা ও আধা-পাকা ধান। জানা যায়, বাঁধ নির্মাণ করা হয়েছে শুধু পাহাড়ি ঢলের পানি ঠেকাতে। বৃষ্টির পানি নিষ্কাশনের কোনো ব্যবস্থাই রাখা হয়নি পরিকল্পনায়। ২০১৭ সালে ঠিকাদারি প্রথা বাতিল করে পিআইসি গঠনের পর বাঁধের সংখ্যা বাড়িয়ে শুধু লুটপাটের নতুন নতুন কৌশল নেওয়া হয়।
কৃষকরা বলছেন, হাওড় রক্ষা বাঁধ নির্মাণ সরকারি বরাদ্দের অপচয় ছাড়া কিছুই নয়। পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) কর্মকর্তারা আগামীতে হয়তো নতুন পরিকল্পনা সামনে নিয়ে হাজির হবেন। আসলে হাওড় যেন কর্মকর্তাদের অভিজ্ঞতার পাঠশালা হয়ে উঠেছে। সরকারের শত শত কোটি টাকা ব্যয়ে কেন পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা রাখা হলো না, তা নিয়ে হাজারো প্রশ্ন কৃষকের। পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা থাকলে এপ্রিলের টানা বৃষ্টিতে জলাবদ্ধতা পরিস্থিতি থেকে অনেক ধান রক্ষা করা সম্ভব হতো।
পাউবোর মহাপরিচালক মো. এনায়েত উল্লাহ বৃহস্পতিবার বলেন, এবার সব দুর্যোগ একসঙ্গে ঘটেছে। যে কারণে অসময়ে ফসলহানি হয়েছে। আবহাওয়া বিশ্লেষণে দেখা গেছে, ৩০ এপ্রিলের আগে বৃষ্টিপাত তেমন হয় না। এবার কিন্তু প্রচুর বৃষ্টি হয়েছে। অধিকাংশ জায়গায় পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নেই। ক্ষয়ক্ষতির আরও বড় কারণ হচ্ছে কৃষক ধান কাটতে পারেনি শুকানোর ভয়ে। এরকম উভয় সংকট কৃষকের সর্বনাশ করেছে। আল্লাহ যদি সহায় হন, অবশিষ্ট ৩৮ শতাংশ ধান কেটে ঘরে তোলা সম্ভব হবে।
কৃষি কর্মকর্তারা বলেছেন, হাওড়ে বাঁধ নির্মাণে অধিক গুরুত্ব পেয়েছে পাহাড়ি ঢলের পানি ঠেকানো। বৃষ্টির পানিতেও যে ফসলের ক্ষতি হতে পারে সে বিষয়টি গুরুত্ব কম দেওয়া হয়েছে। এবার অসময়ে বৃষ্টি নতুন পরিকল্পনা সংযুক্ত করেছে। ইতোমধ্যেই পানি নিষ্কাশনে সব ব্যবস্থা গ্রহণে কার্যক্রম শুরু করেছে পাউবো। প্রতিটি বাঁধের নিচে পানি নিষ্কাশনের আধুনিক ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি। তিনি বলেন, যেসব বাঁধ কেটে পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা নিয়েছে স্থানীয় কৃষক সেসব স্থানে স্থায়ী নিষ্কাশন ব্যবস্থার পরিকল্পনা নিয়েছি। এবার নিষ্কাশন ব্যবস্থা না থাকায় ২৬টি বাঁধ কেটে ফেলেছে স্থানীয় কৃষকরা। পানি নিষ্কাশনের পর জরুরিভাবে এসব স্থান ভরাট করে পাহাড়ি ঢলের ঝুঁকি থেকে হাওড়কে সুরক্ষিত করা হয়েছে।
পাউবো সিলেটের অতিরিক্ত প্রধান প্রকৌশলী (চলতি দায়িত্ব) মো. কাইসার আলম বৃহস্পতিবার বলেন, সুনামগঞ্জে পাউবোর অন্তর্ভুক্ত হাওড়ের সংখ্যা ৫২টি। এতে রেগুলেটরের (পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা) সংখ্যা ৫০টি। এর মধ্যে সচল রেগুলেটর ৩২টি, আংশিক সচল ১৮টি। এছাড়া ২০২৪-২৫ অর্থবছরে এশিয়ান ডেভেলপমেন্ট ব্যাংকের (এডিবি) মাধ্যমে প্রায় ৫শ কোটি টাকা বরাদ্দে কিছু কাজ করা হচ্ছে। আংশিক সচলগুলো মেরামত করা দরকার। হাওড়ের পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ঠিক করতে অতিরিক্ত ৬৭টি নতুন ড্রেনেজ স্ট্রাকচার নির্মাণ করা দরকার।
তথ্যানুসন্ধানে জানা যায়, ২০১৭ সাল থেকে ঠিকাদারি প্রথা বাতিল করে পিআইসি গঠন করে সরকার। মাঠে জমি যার, পিআইসিতে তাদের গুরুত্ব দিয়ে কমিটি করার কথা। কিন্তু রাজনৈতিক ও প্রভাবশালীদের তদবিরে কমিটি গঠন নিয়েও অনেক অভিযোগ রয়েছে। যে কারণে অপ্রয়োজনীয় বাঁধের পাশাপাশি কমিশনের বিনিময়ে অতিরিক্ত বরাদ্দ ভাগাভাগি হয়েছে। প্রতিবছর বাঁধের সংখ্যা বাড়িয়ে কোটি কোটি টাকা লুটপাট করেছেন কর্মকর্তারা। ২০২০ সালে টাস্কফোর্সের জরিপে ‘যেভাবে ব্যয় বাড়িয়ে ডিসির নেতৃত্বে লুটপাট’ সংক্রান্ত সাগরচুরির একটি চিত্র পাওয়া যায়। তখন পাউবোর টাস্কফোর্স নিয়ন্ত্রণ করতেন পাউবোর তৎকালীন অতিরিক্ত মহাপরিচালক কাজী তোফায়েল হোসেন।
জরিপের নথিপত্রে দেখা যায়, ‘মাটির কাজে সর্বোচ্চ বেশি বিল ধরা হয় ৫০৪ শতাংশ। যেখানে খরচ হওয়ার কথা ২ লাখ ৯ হাজার টাকা, সেখানে বরাদ্দ দেওয়া হয় ১৭ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। ওই সময় সুনামগঞ্জের নির্বাহী প্রকৌশলী ছিলেন সবিবুর রহমান। ওই ঘটনায় তাকে শাস্তি না দেওয়ায় এই দুর্নীতির লাগাম টেনে ধরা সম্ভব হয়নি। সবিবুর রহমান ছিলেন আওয়ামী সরকারের পানিসম্পদ প্রতিমন্ত্রী কর্নেল (অব.) জাহিদ ফারুকের অঘোষিত ক্যাশিয়ার। এই দুর্নীতিবাজ পাউবো নিয়ন্ত্রণ করার সুযোগ পুরোটা কাজে লাগান। আওয়ামী লীগের শেষ ৫ বছরে সাবিবুর শতকোটি টাকা কামিয়েছেন বলে অভিযোগ রয়েছে। পরে পদোন্নতি পেয়ে হয়ে হন তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী। ওই সময় সুনামগঞ্জের জেলা প্রশাসক ছিলেন আব্দুল আহাদ। তিনি সবিবুর রহমানের ভ্যারিয়েশনকে (অতিরিক্ত বরাদ্দ দেখানো) পুঁজি করে পিআইসির অনুকূলে চূড়ান্ত বিল প্রদানে ২০ কোটি ৬ লাখ ৫ হাজার টাকা জরুরি ভিত্তিতে অবমুক্তকরণে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণের অনুরোধ করেন।
এর আগেই পানিসম্পদ মন্ত্রণালয়ের নির্দেশে পাউবোর টাস্কফোর্সের নিয়মানুযায়ী তাদের গোপন জরিপে নামে হাওড় এলাকায়। এ সময় তারা গুরুত্বপূর্ণ ১৯টি বাঁধ সংস্কার ও নির্মাণের বিষয়ে খোঁজ করতে গিয়ে কেঁচো খুঁড়তে সাপ বেরিয়ে আসে। ওই সময়ে জেলার দোয়ারাবাজারে অবস্থিত কালনার হাওড়ের একটি অংশে গঠিত ২৫নং পিআইসির অনুকূলে ৩ হাজার ৫২৫ দশমিক ৮৪ ঘনমিটার মাটি কাটার বিল ধরা হয়। বাস্তবে এই বাঁধ পরিদর্শন করে টাস্কফোর্স ৫৮৩ দশমিক ৭ ঘনমিটার মাটির প্রয়োজনীয়তার কথা প্রকাশ করে। এই বাঁধটিতে ৫০৪ দশমিক ৭০ পার্সেন্ট ভ্যারিয়েশন করা হয়েছে বলে জানানো হয়। টাস্কফোর্সের হিসাবে এই বাঁধে ২ লাখ ৯ হাজার টাকা খরচ হওয়ার কথা। কিন্তু সেখানে বরাদ্দ দেওয়া হয় ১৭ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। চাঞ্চল্যকর তথ্য হলো, সমাপ্ত বিল পরিশোধের নামে এই পিআইসিকে জেলা কমিটি এখন ১২ লাখ ৬৮ হাজার টাকা দেওয়ার সুপারিশ করেছে। জগন্নাথপুরের নলুয়ার হাওড়ে ২৬নং পিআইসিকে ১ হাজার ৩৩৬ দশমিক ৯১ ঘনমিটার হিসাব করে বরাদ্দ দেওয়া হয় ৮ লাখ ১ হাজার টাকা। টাস্কফোর্সের জরিপে এই বাঁধ মেরামতে মাটি লাগার কথা বলা হয়েছে ৬৮৬ দশমিক ৫২ ঘনমিটার। এই পিআইসিতে ৯৪ দশমিক ৭৪ পার্সেন্ট ভ্যারিয়েশন করার তথ্য দেয় টাস্কফোর্স। টাস্কফোর্সের হিসাবে বরাদ্দ হওয়ার কথা ৩ লাখ ২৮ হাজার টাকা। আর সমাপ্ত বিল পরিশোধের ক্ষেত্রে ৬ লাখ ৩৯ হাজার টাকা পরিশোধের সুপারিশ করে জেলা কমিটি। দিরাই উপজেলার চাপতির হাওড় রক্ষায় একটি অংশে গঠিত ৮৫নং পিআইসিকে ৬ হাজার ২৮৬ দশমিক ২৯ ঘনমিটার মাটির প্রয়োজনীয়তার হিসাব করে বরাদ্দ ধরা হয় ১৯ লাখ ৩৫ হাজার টাকা। এই বাঁধে টাস্কফোর্সের হিসাবে আসে ৪ হাজার ৭৫৫ দশমিক ৩ ঘনমিটার মাটি। এই হিসাবে ১১ লাখ ২৮ হাজার টাকা বিল হওয়ার কথা। সর্বশেষ চূড়ান্ত বিল পরিশোধে জেলা কমিটি তখন সুপারিশ করে ১২ লাখ ৬৮ হাজার টাকা। এই পিআইসিতে ভ্যারিয়েশন করা হয়েছে ১১ দশমিক ৯৪ পার্সেন্ট। একই চাপতির হাওড়ের আরেকটি অংশে গঠিত ৮৫(ক) পিআইসিকে ৬ হাজার ২৮৬ দশমিক ৫৯ ঘনমিটার মাটির হিসাব ধরে বরাদ্দ দেওয়া হয় ১৯ লাখ ৩১ হাজার টাকা। এখানে টাস্কফোর্স জরিপ করে দেখেছে ৪ হাজার ২৭২ দশমিক ১৫ ঘনমিটার মাটি লাগার কথা। এই হিসাবে বরাদ্দ হওয়ার কথা ৭ লাখ ৩৮ হাজার টাকা। এখানে ভ্যারিয়েশন করা হয় ৪৭ দশমিক ১৫ পার্সেন্ট। চূড়ান্ত বিলে জেলা কমিটি ১৩ লাখ ৯৭ হাজার টাকা পরিশোধের সুপারিশ করে। চাপতির হাওড়ের ৮৬নং পিআইসিকে ৪ হাজার ৯২০ দশমিক ঘনমিটার মাটির হিসাব করে বরাদ্দ দেওয়া হয় ২১ লাখ ১৩ হাজার টাকা। টাস্কফোর্স জরিপ করে ৩ হাজার ৫৯০ ঘনমিটার মাটির তথ্য দেয়। এই হিসাবে বরাদ্দ হওয়ার কথা ৬ লাখ ৯৩ হাজার টাকা। অথচ তৎকালীন পিআইসি কমিটি এই বাঁধে চূড়ান্ত বিলে সুপারিশ করেছে ১১ লাখ ১০ হাজার টাকা। এখানে ভ্যারিয়েশন করা হয় ৩৭ দশমিক ৫ পার্সেন্ট।
(যুগান্তর)