বুধবার, ২১ অক্টোবর ২০২৬, ১০:৪৭ পূর্বাহ্ন




স্বর্ণ চোরাচালানের সবচেয়ে বড় করিডোর কি বাংলাদেশ?

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: শনিবার, ১৫ জুলাই, ২০২৩ ৭:২০ pm
গহনা অলঙ্কার দুল চুড়ি হাড় সীতা পায়েল নূপুর অলংকার গয়না জুয়েলারি jewellery gold coin স্বর্ণ মুদ্রা সোনা
file pic

২০২১ সালের সেপ্টেম্বর। গোপন সংবাদের ভিত্তিতে ঢাকার মালিবাগ ছেড়ে যাওয়া সাতক্ষীরাগামী সোহাগ পরিবহনের একটি বাসে তল্লাশি চালিয়ে পৌনে সাত কেজি ওজনের স্বর্ণ আটক করে কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তর। স্বর্ণের বারগুলো ড্রাইভারের সিটের নিচে অত্যন্ত কৌশলে লুকানো অবস্থায় ছিল। দীর্ঘক্ষণ তল্লাশি চালানোর পর এগুলোর হদিস পান কাস্টমসের কর্মকর্তারা। আটককৃত স্বর্ণের মূল্য ওই সময়ের হিসাবে প্রায় ৪ কোটি ৪৫ লাখ টাকা।

এর পরের মাসেই গোপন সংবাদের ভিত্তিতে চট্টগ্রামের শাহ আমানত আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের বিভিন্ন পয়েন্টে সতর্কতামূলক অবস্থান নেন কাস্টমস গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। দুবাই ও ওমান থেকে আসা দুটি ফ্লাইট সে সময় বিমানবন্দরে অবতরণ করে। ফ্লাইট দুটি অবতরণের পর গোয়েন্দা কর্মকর্তাদের উপস্থিতি টের পেয়ে বেসামরিক বিমান চলাচল কর্তৃপক্ষের (বেবিচক) এক নিরাপত্তাকর্মী দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করে। সে সময় আশপাশে উপস্থিত গোয়েন্দা ও নিরাপত্তা সংস্থার সদস্যদের সহায়তায় তাকে ধরে ফেলা হয়। তল্লাশি চালিয়ে ওই নিরাপত্তাকর্মীর কোমরে বেল্টের নিচ থেকে হলুদ স্কচটেপে মোড়ানো তিনটি প্যাকেট উদ্ধার করা হয়। প্যাকেটগুলোয় ছিল ৯ কেজি ২৮০ গ্রাম ওজনের ৮০টি স্বর্ণবার, যার মূল্য ওই সময় নিরূপণ করা হয় ৬ কোটি ৬৪ লাখ টাকা। আটক ওই নিরাপত্তাকর্মী জিজ্ঞাসাবাদে জানিয়েছিলেন স্বর্ণবারগুলো দেশে আনা হয়েছে চোরাচালানের উদ্দেশ্যে। দেশে আনার পর এগুলো রাখা হয়েছিল বিমানবন্দরের টয়লেটে। তার কাজ ছিল নিরাপদে চোরাচালানকৃত স্বর্ণ বিমানবন্দরের বাইরে পাচার করা।

এরপর গত দেড় বছরে দেশে স্বর্ণ চোরাচালানের এমন অনেক ঘটনা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়েছে। আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ আর্থিক ও শুল্ক খাতের বিভিন্ন সংস্থার সদস্যরাও বলছেন, স্বর্ণ চোরাচালান এখন উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে। এখন পর্যন্ত এর সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে উড়োজাহাজের ক্রু-বিমানবালা, বিমানবন্দরের নিরাপত্তাকর্মী, পরিচ্ছন্নতাকর্মী ছাড়াও আরো অনেকেই ধরা পড়েছেন। চোরাচালানের সঙ্গে জড়িতরা বিভিন্ন উৎস থেকে সংগ্রহ করা স্বর্ণ নিয়ে আসছে বাংলাদেশে। মূলত ভারতে পাচারের জন্যই বাংলাদেশে এ স্বর্ণ চোরাচালান করে আনা হচ্ছে। এরই মধ্যে আন্তর্জাতিক স্বর্ণ চোরাচালান রুটের সবচেয়ে বড় করিডোরগুলোর একটি হয়ে উঠেছে বাংলাদেশ। যথাযথভাবে মোকাবেলা করতে না পারলে সামনের দিনগুলোয় তা আরো মারাত্মক রূপ নেয়ার বড় আশঙ্কা রয়েছে।

বর্তমানে বৈশ্বিক স্বর্ণ আমদানি ও স্বর্ণগহনা রফতানি—দুই দিক থেকেই ভারতের অবস্থান শীর্ষে। দেশটিতে এখন প্রতিনিয়তই সম্প্রসারিত হচ্ছে স্বর্ণের কালোবাজার। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল (ডব্লিউজিসি) জানিয়েছে, এ মুহূর্তে বিশ্বব্যাপী গৃহস্থালি পর্যায়ে স্বর্ণের সবচেয়ে বড় মজুদ রয়েছে ভারতে। দেশটির পরিবারগুলোর কাছে জমা স্বর্ণের পরিমাণ ২৫ হাজার টন। বিয়ে, ধর্মীয় উৎসব ও পারিবারিক নানা অনুষ্ঠানে ব্যবহারের জন্য দেশটিতে স্বর্ণের চাহিদা প্রতিনিয়তই বেড়ে চলেছে।

ক্রমবর্ধমান এ চাহিদার কারণে ভারত এখন বৈশ্বিক স্বর্ণ চোরাচালানের সবচেয়ে বড় গন্তব্যদেশ হয়ে উঠেছে। দেশটির ডিরেক্টোরেট অব রেভিনিউ ইন্টেলিজেন্সের তথ্য অনুযায়ী, চাহিদা অনেক বেশি হলেও ভারতে বৈধ পথে স্বর্ণ আমদানি করতে হলে বড় অংকের শুল্ক পরিশোধ করতে হয়। এ কারণে দেশটিতে স্বর্ণ ব্যবসায়ীদের অনেকেই এখন পণ্যটি চোরাচালানের সঙ্গে জড়িয়ে পড়ছেন। আর দেশটিতে চোরাচালানকৃত স্বর্ণের সবচেয়ে বড় উৎস এখন বাংলাদেশ ও মিয়ানমার। ভারতে এখন পর্যন্ত আটক করা পাচারকৃত স্বর্ণের ৭৩ শতাংশই এসেছে বাংলাদেশ ও মিয়ানমার থেকে। দেশটিতে চীন থেকে আসা স্বর্ণ চোরাচালান হচ্ছে মিয়ানমার হয়ে। আর মধ্যপ্রাচ্য-আফ্রিকাসহ অন্যান্য উৎস থেকে পাচার হওয়া স্বর্ণের সবচেয়ে বড় করিডোর এখন বাংলাদেশ।

বর্ডার গার্ড বাংলাদেশের (বিজিবি) তথ্যেও দেখা যায়, বাংলাদেশ হয়ে ভারতে স্বর্ণ পাচার এখন ক্রমেই বেড়ে চলেছে। ২০২২ সালের জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সাত মাসে বাহিনীটি সীমান্তে পাচারের সময় মোট স্বর্ণ আটক করেছিল ৫৯ কেজি ৪৬৮ গ্রাম। আর চলতি ২০২৩ সালের মে মাস পর্যন্ত বছরের প্রথম পাঁচ মাসেই ১২১ কেজি ৪৭৯ গ্রাম স্বর্ণ আটকের তথ্য জানিয়েছে বিজিবি।

তবে বাংলাদেশ ও ভারত—উভয় দেশেরই খাতসংশ্লিষ্টদের বক্তব্য হলো দুই দেশে আইন-শৃঙ্খলা ও সীমান্তরক্ষী বাহিনীর হাতে যে পরিমাণ স্বর্ণ আটক হচ্ছে, পাচার হচ্ছে প্রকৃতপক্ষে তারও বেশি। ওয়ার্ল্ড গোল্ড কাউন্সিল (ডব্লিউজিসি) ২০২২ সালে ভারতে পাচারকৃত স্বর্ণের সম্ভাব্য পরিমাণ প্রাক্কলন করেছে ১৬০ টন (১ টন = ১ হাজার কেজি)। সংস্থাটির হিসাব অনুযায়ী, ২০২২ সালে ভারতে কভিডপূর্ব কালের তুলনায় স্বর্ণ চোরাচালান বেড়েছে ৩৩ শতাংশ।

স্বর্ণ চোরাচালান বেড়ে যাওয়ার বিষয়ে দেশটির নীতিনির্ধারকদের সন্দিহান করে তোলার আরেকটি বড় কারণ হলো ভারতে স্বর্ণের বৈধ আমদানি বেড়ে যাওয়া। দেশটির অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারমণের সন্দেহ, বৈধ পথে স্বর্ণ আমদানি বৃদ্ধির সঙ্গে চোরাচালান বেড়ে যাওয়ারও কোনো না কোনো সংযোগ রয়েছে। কয়েক মাস আগে তিনি বলেছিলেন, যখনই ভারতে স্বর্ণের আমদানি বাড়তে দেখা গেছে, তখনই চোরাচালানও বেড়ে যেতে দেখা গেছে। এর পরিপ্রেক্ষিতে সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের বিষয়টি নিয়ে আরো গভীর অনুসন্ধান চালানো উচিত বলেও সে সময় মন্তব্য করেছিলেন তিনি।

বাংলাদেশ থেকে স্বর্ণ পাচারে দেশের দক্ষিণ-পশ্চিমাঞ্চলীয় জেলাগুলোর সীমান্তকেই বেশি ব্যবহার করা হচ্ছে বলে সন্দেহ করছেন সংশ্লিষ্টরা। বিশেষ করে যশোরের সীমান্ত অঞ্চল স্বর্ণ চোরাচালানের ট্রানজিট রুট হিসেবে ব্যবহার হচ্ছে অনেক আগে থেকেই। তবে সাম্প্রতিক সময়ে সেখান দিয়ে পাচারের সময় স্বর্ণ আটকের পরিমাণও বেড়েছে।

নাম অপ্রকাশিত রাখার শর্তে যশোরের একাধিক ব্যাংকের শাখা ব্যবস্থাপক ও ব্যবসায়ী নেতারা জানিয়েছেন, স্বর্ণ চোরাচালানের ক্ষেত্রে লেনদেন হয় প্রধানত হুন্ডি ও হাওলার মাধ্যমে। ব্যবসায়ীরা পণ্য আমদানি করতে যে পরিমাণ টাকার এলসি করেন, তার ১০ গুণ পাঠান হুন্ডির মাধ্যমে। সে টাকাই প্রধানত স্বর্ণ চোরাচালানে ব্যবহার হয়।

বেনাপোল সীমান্তের একাধিক সিঅ্যান্ডএফ এজেন্ট বিষয়টি নিশ্চিত করে জানিয়েছেন, পশ্চিমবঙ্গে এখন বাংলাদেশী টাকার চাহিদা বাড়তে দেখা যাচ্ছে, এর একটি বড় কারণ হলো স্বর্ণের চোরাচালান বৃদ্ধি।

সীমান্তবর্তী সূত্র ও ভারতীয় সংবাদমাধ্যমগুলোর তথ্য অনুযায়ী, দেশটির বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকায়, বিশেষ করে পশ্চিমবঙ্গে এখন বাংলাদেশী টাকার চাহিদা বেড়েছে। বাংলাদেশে বিভিন্ন পণ্য পাচার ও চোরাচালানকারী ব্যবসায়ীদের অনেকেই এখন মূল্য হিসেবে বাংলাদেশী টাকা নিচ্ছেন। স্বর্ণ চোরাচালানে যুক্ত বাংলাদেশীরা এ টাকা আবার গ্রহণ করছেন পাচারকৃত পণ্যের মূল্য হিসেবে। আবার বাংলাদেশ থেকে স্থলসীমান্তে পণ্য আমদানির ক্ষেত্রে এলসি খুলতে গিয়ে আন্ডার ইনভয়েসিং (আমদানি পণ্যের পরিমাণ কম দেখানো) ও হুন্ডির মাধ্যমেও টাকা পাচার হওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

দেশে প্রধান শ্রমবাজার এখন মধ্যপ্রাচ্যের দেশগুলো। ভারতে চোরাচালানকৃত স্বর্ণের বড় একটি অংশও আসছে সেখান থেকে। সাম্প্রতিক সময়ে বৈধ চ্যানেলের পরিবর্তে হুন্ডি-হাওলায় প্রবাসীদের অর্থের বড় অংশ দেশে আসার অভিযোগ উঠেছে। আবার স্বর্ণ চোরাচালানেও লেনদেনের প্রধান মাধ্যম হিসেবে হুন্ডি-হাওলাকেই চিহ্নিত করছেন পর্যবেক্ষকরা। সব মিলিয়ে অর্থনীতিতে চাপ সৃষ্টির পাশাপাশি চোরাচালান কার্যক্রমেরও প্রধান ভরকেন্দ্র হয়ে উঠেছে লেনদেনের অবৈধ ও অপ্রাতিষ্ঠানিক মাধ্যম হুন্ডি-হাওলা।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উন্নয়ন অধ্যয়ন বিভাগের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর বলেন, ‘পুঁজি পাচার মূলত তিনভাবে হয়ে থাকে। প্রথমত অফিশিয়াল চ্যানেলে, দ্বিতীয়ত হাওলা-হুন্ডিতে এবং তৃতীয়ত চোরাকারবারির মাধ্যমে। আর রেমিট্যান্সের অর্থ যদি কোনোভাবে পাচার কার্যক্রমের সঙ্গে জড়িত হয়ে পড়ে, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই রিজার্ভের ওপর চাপ পড়বে। আবার বৈদেশিক মুদ্রার জোগান কমে গেলে, বিনিময় হারে অসামঞ্জস্যতা থাকলে ও অবক্ষয়ের কারণেও চোরাচালান বেড়ে যায়। বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে আনডকুমেন্টেড ট্রেড বা চোরাচালান অনেক বেশি। বাংলাদেশে যেহেতু আনুষ্ঠানিকভাবে স্বর্ণ আমদানি-রফতানি হয় না, এখানে শুল্কহার সংক্রান্ত তেমন কোনো বাধাও নেই। সেক্ষেত্রে যেসব দেশ একই সঙ্গে বড় স্বর্ণ আমদানিকারক ও রফতানিকারক; সেসব দেশে এখান থেকে স্বর্ণ পাচার হলে এর সঙ্গে জড়িত দুই পক্ষেরই লাভবান হওয়ার সুযোগ থাকে।’

দেশে চোরাচালানের স্বর্ণ সবচেয়ে বেশি আটক হয় যশোরসহ দক্ষিণ-পশ্চিমের জেলাগুলোর সীমান্তে। এসব জেলার স্থানীয় জুয়েলারি ব্যবসায়ীদের সন্দেহ, সীমান্তে পাচারের সময় বিজিবি যে পরিমাণ স্বর্ণ আটক করতে পারে, চোরাচালানের প্রকৃত পরিমাণ তার চেয়ে অন্তত কয়েক গুণ বেশি। আর গত তিন বছরে পাচারের সময় যশোরে প্রায় ১৫০ কেজি স্বর্ণ আটক হয়েছে বলে স্থানীয় বিজিবি ও কাস্টমস সূত্রে জানা গেছে।

এ বিষয়ে বিজিবি যশোর ব্যাটালিয়নের (৪৯ বিজিবি) অধিনায়ক লে. কর্নেল আহমেদ হাসান জামিল বলেন, ‘‌স্বর্ণসহ বিভিন্ন পণ্যের চোরাচালান রোধে আমাদের বিজিবি সদস্যরা কাজ করছেন। বিশেষ করে স্বর্ণ চোরাচালানের সিন্ডিকেট ভেঙে দিতে আমাদের গোয়েন্দা টিম কাজ করছে। এর সঙ্গে যারাই জড়িত থাকুক না কেন, তাদের ছাড় দেয়া হবে না।’

ভারতীয় সংবাদমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, গত তিন বছরে দেশটির সীমান্তরক্ষী বাহিনী বর্ডার সিকিউরিটি ফোর্স (বিএসএফ) বাংলাদেশ থেকে পাচারকৃত স্বর্ণ জব্দ করেছে ১৩৩ কেজি। ভারতীয় সংবাদমাধ্যম সানডে গার্ডিয়ানে কয়েক মাস আগে পশ্চিমবঙ্গ-বাংলাদেশ সীমান্তে নিয়োজিত এক জ্যেষ্ঠ বিএসএফ কর্মকর্তার উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছিল, যেটুকু ধরা পড়েছে সেটি বাংলাদেশ থেকে ভারতে পাচারকৃত স্বর্ণের মোট পরিমাণের তুলনায় একেবারেই ক্ষুদ্র অংশমাত্র। তিন বছরে আটকের তথ্য দিয়ে প্রকৃত চিত্র কোনোভাবেই পাওয়া যাবে না। বিএসএফ শুধু তথ্য পেলেই আটক করতে পারে। এর বাইরে যা পাচার হচ্ছে, চোখের আড়ালেই থেকে যাচ্ছে। [বণিক বার্তা]




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD