মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর ২০২৬, ১১:০০ অপরাহ্ন




ছাড়তেই উধাও হয়ে যায় টিকিট, এবার এজেন্সি বদলাচ্ছে রেলওয়ে

আউটলুক বাংলা রিপোর্ট
  • প্রকাশের সময়: মঙ্গলবার, ২০ অক্টোবর, ২০২৬ ৮:৫৮ pm
rail ticket tickets online Point of Sales Railway buy train রেলওয়ে টিকিট যাত্রী রেল ভবন রেলপথমন্ত্রী নুরুল ইসলাম সুজন রেলমন্ত্রী কালোবাজারী ভ্রমণ টিকিটিং ট্রেন টিকিটিং পস মেশিন পাসপোর্ট নিবন্ধন এনআইডি জন্মনিবন্ধন সনদ আন্তঃনগর ফটোকপি আইডি কার্ড টিটিই জরিমানা রিফান্ড রেলের টিকিট রেল টিকিট rail railways রেলমন্ত্রী train Rail Railway Setu Bridge রেলওয়ে সেতু রেল ট্রেন train duel platform railway train
file pic

অনলাইনে ট্রেনের টিকিট ছাড়ার কয়েক মিনিটের মধ্যে উধাও হয়ে যাওয়া, স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার বা বট ব্যবহার করে টিকিট ব্লক করা এবং কালোবাজারির অভিযোগের মধ্যে টিকিট ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের উদ্যোগ নিয়েছে বাংলাদেশ রেলওয়ে। আগামী মাসে টিকেটিং সিস্টেম পরিচালনার জন্য নতুন এজেন্সি নিয়োগ দিতে দরপত্র আহ্বান করতে যাচ্ছে সংস্থাটি।

এরই মধ্যে টিকিট ব্যবস্থাপনা-সংশ্লিষ্ট সব প্রশাসনিক বিষয় নিজেদের আওতায় নেওয়া হয়েছে বলে জানিয়েছে রেলওয়ে।

জানা গেছে, টিকেটিং সিস্টেম নিয়ে রেলওয়ের আইটি অডিটে গুরুতর কিছু অনিয়ম ও নিরাপত্তাঝুঁকির তথ্য উঠে এসেছে। এতে বলা হয়েছে, সাধারণ যাত্রীদের জন্য অনলাইনে টিকিট ছাড়ার কয়েক দিন আগেই অ্যাডমিন ড্যাশবোর্ড ব্যবহার করে টিকিট ব্লক করার সুযোগ রয়েছে। এই সুযোগ নিতে পারেন টিকেটিং সিস্টেমের ভেন্ডর প্রতিষ্ঠান সহজের প্রতিনিধি ও রেলওয়ের বুকিং সহকারীরা। অডিটে সহজের কর্মীদের পরিচালনায় প্রায় ১৬৯টি অ্যাডমিন অ্যাকাউন্টের তথ্য পাওয়া গেছে। অডিট প্রতিবেদনের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী, সহজের প্রতিনিধি ও বুকিং সহকারীদের যোগসাজশে টিকিট ব্লক করে কালোবাজারির সুযোগ তৈরি হতে পারে।

২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত বাংলাদেশ রেলওয়ের সমন্বিত টিকেটিং সিস্টেম (বিআরআইটিএস) নিয়ে করা এই অডিটে যাত্রীদের ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা, টিকিট বিক্রির আয় সরকারি কোষাগারে জমা এবং ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে জরিমানা আদায় নিয়েও প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অডিট প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, অনলাইন টিকিট বিক্রির আয়ের তুলনায় কম অর্থ সরকারি কোষাগারে জমা দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া সিস্টেম দীর্ঘ সময় অকার্যকর থাকায় সহজ লিমিটেডের কাছ থেকে ১ কোটি ৩৯ লাখ ৮৮ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়নি।

পরিবহন অডিট অধিদপ্তরের মহাপরিচালকের দপ্তর থেকে গত ১৬ আগস্ট বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালককে পাঠানো চিঠিতে আইটি অডিট দলের ইস্যু করা ২২টি অডিট মেমো গ্রহণ করে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করা হয়েছে। এসব পর্যবেক্ষণ রেলওয়ের অনলাইন টিকিট ব্যবস্থার পরিচালনা, নিরাপত্তা ও আর্থিক ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন সামনে এনেছে।

বট দিয়ে টিকিট ব্লক, কালোবাজারির অভিযোগ

অনলাইনে টিকিট প্রকাশের পরপরই তা শেষ হয়ে যাওয়ার পেছনে স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার বা বট ব্যবহারের অভিযোগ সামনে এসেছে। বাংলাদেশ রেলওয়ের একটি অভ্যন্তরীণ অনুসন্ধানে এ ধরনের কার্যক্রমের তথ্য উঠে এসেছে।

নথিতে বলা হয়েছে, ‘bookmyrailbd.com’ নামের একটি ওয়েবসাইটের মাধ্যমে স্বয়ংক্রিয় সফটওয়্যার ব্যবহার করে রেলওয়ের ই-টিকেটিং সিস্টেম থেকে টিকিট বিক্রি শুরুর সঙ্গে সঙ্গেই বিপুলসংখ্যক টিকিট ব্লক করা হচ্ছিল। পরে এসব টিকিট অননুমোদিত ওয়েবসাইটের মাধ্যমে সাধারণ যাত্রীদের কাছে বাড়তি দামে বিক্রির অভিযোগ রয়েছে। রেলওয়ের ওই নথিতে বলা হয়েছে, এ ধরনের কার্যক্রমের ফলে সাধারণ যাত্রীরা ন্যায্যমূল্যে টিকিট পাওয়া থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন। পাশাপাশি ই-টিকেটিং ব্যবস্থার নিরাপত্তা ও সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হচ্ছে।

এ ঘটনায় টিকিট বিক্রির দায়িত্বে থাকা ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন জেভির কাছে ব্যাখ্যা চাওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়েছে। নথির শেষাংশে অভিযোগের বিষয়ে ব্যাখ্যা চেয়ে প্রতিষ্ঠানটির ব্যবস্থাপনা পরিচালকের কাছে চিঠি পাঠানোর প্রস্তাব করা হয়। ১১ অক্টোবর স্বাক্ষরিত চিঠিতে তিন কার্যদিবসের মধ্যে ব্যাখ্যা চাওয়ার প্রস্তাবের কথাও উল্লেখ রয়েছে।

বাংলাদেশ রেলওয়ের ইন্টিগ্রেটেড টিকেটিং সিস্টেম (বিআরআইটিএস) পরিচালনার দায়িত্বে রয়েছে সহজ-সিনেসিস-ভিনসেন জেভি। রেলওয়ের অভ্যন্তরীণ নথিতে প্রতিষ্ঠানটির সঙ্গে স্বাক্ষরিত চুক্তির নিরাপত্তা সংক্রান্ত শর্তের বিষয়টিও উল্লেখ করা হয়েছে। চুক্তির কারিগরি শর্তের নিরাপত্তা অংশে ই-টিকেটিং অবকাঠামোর নিরাপত্তা নিশ্চিত করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। ফলে বট ব্যবহার করে টিকিট ব্লক করার অভিযোগ ব্যবস্থাটির নিরাপত্তা কতটা কার্যকর, সেই প্রশ্ন সামনে এনেছে।

বিআরআইটিএসের মূল ডেটাবেইস আমাজন ওয়েব সার্ভিসেসের (এডব্লিউএস) সিঙ্গাপুর অঞ্চলে ভার্চুয়াল প্রাইভেট ক্লাউডে সংরক্ষিত থাকায় নিরাপত্তাঝুঁকির বিষয়টিও উঠে এসেছে অডিটে। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ডেটাবেইসটি হ্যাক হলে যাত্রীদের নাম, মোবাইল নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্ম নিবন্ধন নম্বর, ই-মেইল ঠিকানা, ভ্রমণের ইতিহাস এবং আর্থিক লেনদেনের তথ্য চুরি হওয়ার ঝুঁকি রয়েছে। এসব তথ্য ব্যবহার করে প্রতারণার আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে।

একই অডিটে অনলাইন টিকিট বিক্রির আয় থেকে সরকারি কোষাগারে কম অর্থ জমা দেওয়া এবং সিস্টেম দীর্ঘ সময় অকার্যকর থাকায় ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের কাছ থেকে জরিমানা আদায় না করার বিষয়টি উঠে এসেছে। সব মিলিয়ে টিকিট ব্লক করার সুযোগ, অ্যাডমিন অ্যাকাউন্টের ব্যবহার, তথ্যের নিরাপত্তা এবং আর্থিক ব্যবস্থাপনা– বিআরআইটিএসের একাধিক ক্ষেত্রে তদারকি জোরদারের প্রয়োজনীয়তা সামনে এসেছে।

২০২১-২২ থেকে ২০২৫-২৬ অর্থবছর পর্যন্ত টিকিটিং ব্যবস্থা নিয়ে করা অডিটে আর্থিক ব্যবস্থাপনার বিভিন্ন অসংগতি উঠে এসেছে। অনলাইন টিকিট বিক্রির আয়ের তুলনায় সরকারি কোষাগারে কম অর্থ জমা দেওয়ার বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। সিস্টেম দীর্ঘ সময় অকার্যকর থাকায় সহজ লিমিটেডের কাছ থেকে ১ কোটি ৩৯ লাখ ৮৮ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়নি। সব মিলিয়ে টিকিট বিক্রির আয় ও ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠানের দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করার বিষয়ে প্রশ্ন তৈরি হয়েছে।
টিকিট না পেয়ে ভোগান্তিতে পড়েন যাত্রীরা

অনলাইনে টিকিট বিক্রি শুরুর পরপরই শেষ হয়ে যাওয়ার ঘটনায় দীর্ঘদিন ধরেই ভোগান্তিতে আছেন যাত্রীরা। বিশেষ করে ঢাকা, সিলেট, চট্টগ্রাম, কক্সবাজার ও উত্তরবঙ্গ রুটের টিকিট না পেয়ে অনেককে বিকল্প পরিবহনের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে। কেউ কেউ অতিরিক্ত অর্থ দিয়ে কালোবাজারিদের কাছ থেকে টিকিট সংগ্রহের চেষ্টা করেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

ঢাকা থেকে পঞ্চগড়ের নিয়মিত যাত্রী নুরুদ্দীন তাসলিম বলেন, দূরপাল্লার যাত্রী হওয়ায় প্রতি বছর ঈদে ভোগান্তিতে পড়তে হয়। রেলের টিকিট তো পাওয়াই যায় না। গত পাঁচ বছরে দু-একবার ছাড়া বেশিরভাগ সময় রেলের ওয়েবসাইটে টিকিট পাইনি। পরে বাধ্য হয়ে কালোবাজার থেকে চড়া দামে টিকিট কিনতে হয়েছে। সাধারণ যাত্রীরা টিকিট না পেলেও কালোবাজারিরা ঠিকই টিকিট পেয়ে যাচ্ছে।

তিনি বলেন, ঢাকা থেকে গ্রামের বাড়ির দূরত্ব বিবেচনায় অনেক সময় বাধ্য হয়েই অবৈধ পথে টিকিট কিনতে হয়। শুধু ঈদযাত্রা নয়, অন্য সময়েও ১০ দিন আগে টিকিট না কাটলে পাওয়া কঠিন। কোনো বিশেষ প্রয়োজনে দুই দিন আগে বাড়ি যাওয়ার পরিকল্পনা করলে টিকিট মেলে না। ঢাকা থেকে পঞ্চগড়সহ উত্তরাঞ্চলের যাত্রীদের এই ভোগান্তি গত পাঁচ থেকে দশ বছরে একটুও কমেনি। বরং আগের তুলনায় পরিস্থিতির অবনতি হয়েছে।

রেলওয়ের অডিটে টিকিটিং সিস্টেমের মূল ডেটাবেইসের নিরাপত্তাঝুঁকির বিষয়টি উঠে এসেছে। ডেটাবেইস হ্যাক হলে যাত্রীদের নাম, ফোন নম্বর, জাতীয় পরিচয়পত্র বা জন্মনিবন্ধন নম্বর, ভ্রমণের ইতিহাস ও আর্থিক লেনদেনের তথ্য চুরি হতে পারে। এসব তথ্য ব্যবহার করে প্রতারণার আশঙ্কার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে প্রতিবেদনে। তাই নতুন এজেন্সি নিয়োগের পাশাপাশি যাত্রীদের তথ্য সুরক্ষায় কার্যকর নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করাও জরুরি।

গত ৭ অক্টোবর চলচ্চিত্র নির্মাতা ও নাট্যকার আশফাক নিপুণ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দেওয়া এক পোস্টে লেখেন, সেজো মামা, মামী ও মামাতো বোনকে নিয়ে পূজার ছুটিতে কক্সবাজার যাওয়ার জন্য আজ সকাল ৮টায় ট্রেনের টিকিট ছাড়ার অপেক্ষায় ছিলাম। মামার শারীরিক কারণে বাসে দীর্ঘ সময় ভ্রমণ সম্ভব নয়, তাই ট্রেনে যাওয়ার পরিকল্পনা। সকাল ৭টা ৪৫ মিনিট থেকে মোবাইল নিয়ে প্রস্তুত ছিলাম। ঠিক সকাল ৮টায় ‘সার্চ ট্রেন’ চাপতেই চোখের সামনে খুলে গেল সিট প্ল্যান। কিন্তু অবিশ্বাস্যভাবে সকাল ৮টা ১ মিনিটেই দুটি ট্রেনের সব টিকিট শেষ! অথচ একটি টিকিট নির্বাচন থেকে শুরু করে ওটিপি, পেমেন্ট ও কনফার্মেশন শেষ করতে আমার অভিজ্ঞতায় কমপক্ষে সাড়ে ছয় থেকে সাত মিনিট লাগে। তাহলে মাত্র এক মিনিটে দুটি ট্রেনের সব টিকিট বিক্রি হলো কীভাবে?

তিনি আরও লেখেন, বাস্তবতা হলো ঈদ-পূজার মতো দীর্ঘ ছুটিতে অনলাইনে টিকিট কাটতে গিয়ে বারবার একই অভিজ্ঞতার মুখোমুখি হতে হচ্ছে। হাসিনার আমলেও টিকিট পাইনি, এই আমলেও পাই না। আমার প্রশ্ন, এত দ্রুত সব টিকিট শেষ হওয়ার পেছনে কী কাজ করছে? টিকিট সিন্ডিকেটের অভিযোগ দীর্ঘদিনের। বাংলাদেশ রেলওয়ে সফটওয়্যার পরিবর্তনের উদ্যোগ নিলেও সিন্ডিকেটের প্রভাব কাটানো কি সম্ভব হবে? এরা এতটাই শক্তিশালী যে সরকার ও মন্ত্রণালয়ের পরিবর্তন হলেও তাদের কিছু যায় আসে না– এমন ধারণা মানুষের মধ্যে তৈরি হয়েছে।

টিকিট না পাওয়ার এমন অভিজ্ঞতা আছে অনেকের। সাধারণ যাত্রীদের অনেকেই দীর্ঘদিন ধরে একই সমস্যার মুখোমুখি হচ্ছেন। বিভিন্ন সময় গণমাধ্যমে তাদের ভোগন্তির বিষয়টি উঠে এসেছে। তবে টিকিট না পাওয়ার কারণ এবং এর পেছনে কারা দায়ী তা খুঁজে বের করতে এতদিন কিছুই করেনি রেলওয়ে।

টিকেটিং সিস্টেম পরিচালনায় নতুন এজেন্সি নিয়োগের জন্য আগামী মাসে দরপত্র আহ্বানের মধ্য দিয়ে রেলওয়ে অনলাইন টিকিট ব্যবস্থাপনায় পরিবর্তনের প্রক্রিয়া শুরু করতে যাচ্ছে। তবে নতুন এজেন্সি নিয়োগের মাধ্যমে টিকিটের সহজলভ্যতা, ব্যবস্থার নিরাপত্তা, আর্থিক স্বচ্ছতা এবং কালোবাজারি নিয়ন্ত্রণে কতটা অগ্রগতি আসে তা নির্ভর করবে নতুন ব্যবস্থার কার্যকারিতা ও তদারকির ওপর।

বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক ও প্রকৌশলী মো. আফজাল হোসেন মঙ্গলবার (২০ অক্টোবর) দুপুরে বলেন, ‘আমরা ইতোমধ্যে সব প্রশাসনিক বিষয় নিজেদের আওতায় নিয়েছি। আগামী মাসে টিকেটিং সিস্টেম পরিচালনার জন্য নতুন এজেন্সি নিয়োগ দিতে দরপত্র আহ্বান করতে যাচ্ছি।’ ঢাকা পোস্ট




আরো






© All rights reserved © outlookbangla

Developer Design Host BD