আবারও বেড়েছে ডলারের দাম। মঙ্গলবার থেকে বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোতে ডলারের নতুন দাম কার্যকর হয়েছে। এখন রপ্তানি আয়ে এক টাকা বেড়ে ১০৮ টাকা ৫০ পয়সা ও রেমিট্যান্সে ডলারের দাম ৫০ পয়সা বেড়ে ১০৯ টাকা দরে বিক্রি হচ্ছে। ডলারের দাম বৃদ্ধির কারণে বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ এবং পণ্য আমদানিতে ব্যয় বাড়ছে। ডলারের দাম বৃদ্ধির সরাসরি প্রভাব পড়ছে নিত্যপণ্যের দামে। দ্রব্যমূল্যের ঊর্ধ্বগতির কারণে স্বল্প ও সীমিত আয়ের মানুষ দিশেহারা হয়ে পড়েছে। রাশিয়া-ইউক্রেন যুদ্ধের প্রভাবে আন্তর্জাতিক বাজারে সব ধরনের পণ্যের দাম বেড়েছে। এর প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজারে। একই সময়ে বৈশ্বিক মন্দায় দেশের রপ্তানি আয় কমছে এবং রেমিট্যান্স প্রবাহেও নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
দেশে ডলার সংকট দীর্ঘমেয়াদি হওয়ায় অর্থনীতির বিভিন্ন খাতে প্রভাব পড়ছে। ডলার সংকটের প্রভাব পড়েছে জ্বালানি, বিদ্যুৎ ও গ্যাস খাতে। গ্যাসের সংকটে শিল্প উৎপাদন হ্রাস পেয়েছে এবং বেড়েছে শিল্প ও কৃষি খাতের উৎপাদন ব্যয়। এর প্রভাব পড়েছে বিনিয়োগ ও কর্মসংস্থানের ওপর। বাংলাদেশ ব্যাংকের এক প্রতিবেদন থেকে জানা যায়, আগামী অর্থবছরে বাংলাদেশকে সবচেয়ে বেশি বৈদেশিক ঋণ পরিশোধ করতে হবে। আর আইএমএফ বলেছে, আগামী অর্থবছরে রেমিট্যান্স কমবে। জিডিপি বাড়ার কারণে আমদানি বাড়বে। এতে বৈদেশিক মুদ্রার ওপর চাপ বাড়বে, যে কারণে বৈদেশিক মুদ্রার আয়-ব্যয়ের হিসাবে ঘাটতি বেড়ে রেকর্ড উচ্চতায় পৌঁছাবে।
ডলার সংকট কাটাতে রপ্তানি বাড়ানোর ওপর গুরুত্ব দিতে হবে। এ জন্য দেশে বিনিয়োগের আকর্ষণীয় পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। কোনো রপ্তানিকারক কোনোরকম কারসাজির আশ্রয় নেন কিনা সেদিকে নজর রাখতে হবে। ইতোমধ্যে পণ্যের মূল্য অবিশ্বাস্য কম দেখিয়ে আন্ডার ইনভয়েসিংয়ের মাধ্যমে অর্থ পাচারের ঘটনা ঘটেছে। কারসাজির মাধ্যমে প্রায় ১৪৭ কোটি টাকা পাচার করা হয়েছে বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত হয়েছেন কাস্টমস গোয়েন্দারা। এতে পণ্য রপ্তানির বিপরীতে প্রকৃত মূল্য দেশে আসেনি। এ ধরনের কারসাজি রোধে পদক্ষেপ নিতে হবে।
ডলার সংকট কাটাতে রেমিট্যান্সপ্রবাহ বৃদ্ধির পদক্ষেপ নেওয়া জরুরি। দুঃখজনক হলো, নানা উদ্যোগ নেওয়া সত্ত্বেও প্রবাসীদের ব্যাংকিং চ্যানেলে রেমিট্যান্স প্রেরণে আগ্রহ বাড়ানো যাচ্ছে না। তাদের উপার্জিত অর্থের একটি উল্লেখযোগ্য অংশ দেশে প্রেরণ করা হচ্ছে হুন্ডির মাধ্যমে। যারা রেমিট্যান্সের প্রেরক, তাদের একটি বড় অংশ স্বল্পশিক্ষিত। তাদের অনেকে ব্যাংকব্যবস্থা সম্পর্কে অবহিত নন, যে কারণে হুন্ডিতে রেমিট্যান্স পাঠান। দেশের বিপুলসংখ্যক গরিব-স্বল্পশিক্ষিত মানুষ ব্যাংকের সেবা প্রাপ্তিকে জটিল বিষয় হিসাবেই দেখে। ব্যাংকগুলো এসব মানুষের কাছে সহজে সেবা পৌঁছে দিতে না পারলে যত উদ্যোগই নেওয়া হোক, রেমিট্যান্সপ্রবাহ কাঙ্ক্ষিত মাত্রায় বাড়বে কিনা, সে বিষয়ে সন্দেহ থেকেই যায়। বিদেশে কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রে দক্ষ কর্মী প্রেরণের ওপর জোর দেওয়া দরকার। এ জন্য সরকারকে দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা নিতে হবে। প্রবাসীদের সামনে বৈধ চ্যানেলের মাধ্যমে রেমিট্যান্স প্রেরণের গুরুত্ব তুলে ধরার পাশাপাশি তাদের দেশপ্রেমে উদ্বুদ্ধ করার পদক্ষেপ নিতে হবে। দেশে উচ্চ নৈতিকতা ও উন্নত মূল্যবোধের চর্চা না থাকলে প্রবাসীদের যতই আহ্বান জানানো হোক না কেন, তারা বৈধ পথে রেমিট্যান্স প্রেরণে কতটা উৎসাহী হবেন, সে প্রশ্ন থেকেই যায়।