নতুন সার ডিলার নিয়োগ নিয়ে দেশের বিভিন্ন এলাকায় তদবির, রাজনৈতিক প্রভাব, স্বজনপ্রীতি ও আর্থিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। কোথাও স্থানীয় রাজনৈতিক নেতাদের মাধ্যমে পছন্দের প্রার্থীর নাম তালিকায় তোলার চেষ্টা, কোথাও ২০ থেকে ৩০ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের তথ্য মিলেছে। এর মধ্যেই কৃষি মন্ত্রণালয়ে ডিলার নিয়োগের তদবিরে ব্যস্ত সময় কাটাচ্ছেন সংসদ সদস্য (এমপি), রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি ও ডিলার প্রার্থীর প্রতিনিধিরা।
তবে কৃষি মন্ত্রণালয় বলছে, এখনও চূড়ান্ত নিয়োগ হয়নি। আবেদনকারীদের নির্ধারিত যোগ্যতা ও নীতিমালা অনুযায়ী যাচাই-বাছাই করা হচ্ছে। রাজনৈতিক সুপারিশের ভিত্তিতে কাউকে নিয়োগ দেওয়ার সুযোগ নেই বলেও জানিয়েছে মন্ত্রণালয়।
সারাদেশে প্রায় পাঁচ হাজার নতুন সার ডিলার নিয়োগ দেবে সরকার। এ জন্য আবেদন পড়েছে প্রায় ৪৫ হাজার ৯৫টি। অর্থাৎ, প্রতি ডিলারশিপের বিপরীতে গড়ে ৯টি আবেদন জমা পড়েছে। ফলে বাছাই প্রক্রিয়ায় হিমশিম খাচ্ছেন সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।
গত ২৭ আগস্ট সার ডিলার নিয়োগে আবেদন আহ্বান করে কৃষি মন্ত্রণালয়। নীতিমালা অনুযায়ী, প্রতিটি ইউনিয়ন ও পৌরসভায় একজন করে নতুন ডিলার নিয়োগ দেওয়া হবে। ফলে আবেদনকারীদের মাত্র ৯ শতাংশ ডিলারশিপ পাওয়ার সুযোগ পাবেন।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক জ্যেষ্ঠ কর্মকর্তা বলেন, অধিকাংশ আবেদনকারীই মৌলিক যোগ্যতা পূরণ করায় প্রতিযোগিতা তীব্র হয়েছে। যাচাই-বাছাইয়ের সঙ্গে যুক্ত কর্মকর্তারা বিভিন্ন মহল থেকে সুপারিশও পাচ্ছেন। পরিস্থিতির কারণে কেউ কেউ ফোন ধরা বন্ধ করে দিয়েছেন।
নীতিমালা অনুযায়ী, উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটি প্রাথমিক যাচাই শেষে প্রতি ইউনিয়নের জন্য তিনজন যোগ্য প্রার্থীর নাম প্রস্তাব করে। জেলা কমিটির যাচাই শেষে এসব প্রস্তাব কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটিতে পাঠানো হয়। কেন্দ্রীয় কমিটি আবেদন ও তথ্য যাচাই করে প্রতি ইউনিয়নে একজনকে সার ডিলার হিসেবে মনোনয়ন দেবে।
সচিবালয়ে তদবির
গত ১০ সেপ্টেম্বর নতুন ডিলার নিয়োগের আবেদন জমা দেওয়ার সময় শেষ হওয়ার পর থেকেই কৃষি মন্ত্রণালয়ে তদবিরকারীদের আনাগোনা বেড়েছে। গত কয়েক দিনে কৃষিমন্ত্রী ও কৃষি সচিবের দপ্তরের সামনে বিভিন্ন জেলা থেকে আসা রাজনৈতিক নেতা, জনপ্রতিনিধি, ব্যবসায়ী ও আবেদনকারীদের ভিড় দেখা গেছে।
মঙ্গলবার ও গতকাল বৃহস্পতিবার দুপুরের দিকে কৃষিমন্ত্রীর দপ্তরে গিয়ে তাঁকে পাওয়া যায়নি। তাঁর দপ্তরের কর্মরতরা জানান, সারের ডিলার নিয়ে রাজনৈতিক নেতা ও সংসদ সদস্যরা সাক্ষাৎ করতে আসছেন। এতে তিনি বেশ বিব্রত হচ্ছেন, দপ্তরে বসতে স্বাচ্ছন্দ্যবোধ করছেন না। দপ্তরের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, ওই সময়ে বিভিন্ন এলাকার রাজনৈতিক নেতা ও জনপ্রতিনিধিরা ডিলার নিয়োগ-সংক্রান্ত বিষয়ে আসছেন। তাদের কেউ সরাসরি নিজের এলাকার আবেদনকারীর নাম নিয়ে আসছেন, আবার কেউ স্থানীয় নেতাদের সুপারিশপত্র বা আবেদন-সংক্রান্ত কাগজপত্র নিয়ে মন্ত্রণালয়ে যোগাযোগ করছেন। অনেকে কৃষিমন্ত্রীকে দপ্তরে না পেয়ে কৃষি সচিবের কাছে গিয়ে তদবির করছেন। সচিবের দপ্তর কৃষি মন্ত্রণালয়ের গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত নেওয়ার কেন্দ্র হওয়ায়, সেখানে বিভিন্ন জেলা থেকে আসা লোকজনের উপস্থিতি ছিল চোখে পড়ার মতো।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের একাধিক সূত্রের দাবি, গত রোববার থেকে চলতি সপ্তাহে অর্ধশতাধিক সংসদ সদস্য কৃষিমন্ত্রী ও কৃষি সচিবের সঙ্গে দেখা করেছেন। তাদের বড় একটি অংশ নিজ নিজ এলাকার পছন্দের ব্যক্তিকে সার ডিলার হিসেবে নিয়োগ দেওয়ার বিষয়ে কথা বলেছেন।
তদবিরকারীদের মধ্যে শুধু সংসদ সদস্যই নন, বিভিন্ন জেলা ও উপজেলার রাজনৈতিক নেতারাও রয়েছেন। কেউ নিজের এলাকার প্রার্থীর পক্ষে সুপারিশ নিয়ে এসেছেন, কেউ আবেদনকারীর ব্যবসায়িক কাগজপত্র নিয়ে কথা বলেছেন, আবার কেউ উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের বাছাইয়ে নিজের পছন্দের ব্যক্তির নাম কীভাবে তালিকায় রাখা যায়, সে বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে যোগাযোগ করছেন।
ভোলা জেলা বিএনপির যুগ্ম আহ্বায়ক ব্যবসায়ী কবীর মৃধাও নতুন ডিলারের জন্য আবেদন করেছেন। তিনি জানান, তাঁর প্রতিষ্ঠানের নাম মেসার্স কবীর মৃধা। ডিলার নিয়োগের বিষয়ে কথা বলতে তিনি সচিবের দপ্তরের আশপাশে ঘোরাঘুরি করলেও সাক্ষাৎ করতে পারেননি।
কৃষি মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, একজন সংসদ সদস্য তাঁর এলাকার একটি ইউনিয়নে সার ডিলার নিয়োগের জন্য তিনজনের নাম সুপারিশ করে পাঠিয়েছিলেন। পরে ওই তিনজনের মধ্যে তালিকার প্রথম ব্যক্তিকে বাদ দিয়ে অন্য একজনকে নিয়োগ দেওয়ার জন্য একই সংসদ সদস্য আবার তদবির করেন।
মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, উপজেলা পর্যায়ে যাচাই-বাছাই করে প্রতি ইউনিয়ন বা নির্ধারিত এলাকার জন্য তিনজনের নাম প্রস্তাব করা হয়। এর পর জেলা পর্যায়ে পুনরায় যাচাই করে সেই তিনজনের তালিকা কেন্দ্রীয় ব্যবস্থাপনা কমিটির কাছে পাঠানোর হয়েছে। ফলে এই পর্যায়ে রাজনৈতিক সুপারিশের মাধ্যমে তালিকা পরিবর্তনের চেষ্টা হয়ে থাকলে তা নিয়ে প্রশ্ন উঠবে।
নাটোরের সংরক্ষিত নারী আসনের সংসদ সদস্য সানজিদা ইয়াসমিন টুলিকে কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে সচিবের দপ্তর থেকে বের হতে দেখা যায়। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের হাতে ডিলার নিয়োগ-সংক্রান্ত কাগজপত্র ছিল বলে প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন। তিনি তাঁর এলাকার ডিলার নিয়োগ নিয়ে সচিবের সঙ্গে আলোচনা করেন।
বরিশাল জেলা পরিষদের প্রশাসক আকন কুদ্দুসুর রহমানকেও কয়েকজনকে সঙ্গে নিয়ে সচিবের দপ্তর থেকে বের হতে দেখা যায়। প্রত্যক্ষদর্শীরা জানান, তাঁর হাতেও ডিলার নিয়োগ-সংক্রান্ত কাগজপত্র ছিল।
রংপুর সদর উপজেলা বিএনপির সভাপতি মো. মাসুদ রানাও ডিলার নিয়োগের বিষয়ে সচিবালয়ে যাওয়ার কথা জানিয়েছেন। তিনি বলেন, ‘আমার স্ত্রী সার ডিলারের জন্য আবেদন করেছেন। স্ত্রীকে ডিলার হিসেবে নিয়োগের বিষয়ে কথা বলতেই মন্ত্রণালয়ে এসেছি। আমার স্ত্রীর নাম জেলা প্রশাসনের কাছে পাঠানো তিনজনের তালিকায় রয়েছে।’
সম্প্রতি সরকারের শীর্ষ পর্যায়ে জমা দেওয়া সরকারি সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়, স্থানীয় প্রভাবশালী ও রাজনৈতিক নেতাদের সুপারিশে যোগ্যতার বদলে অনুগত ব্যক্তিদের ডিলার নিয়োগ দেওয়ার উচ্চ ঝুঁকি রয়েছে। নতুন ডিলার নিয়োগে নিজেদের পছন্দের লোকদের সুযোগ দিতে প্রভাবশালী মহলের চাপ রয়েছে। এটা হলে প্রকৃত ব্যবসায়ীরা বাদ পড়তে পারেন।
বিভিন্ন জেলায় অনিয়ম
সচিবালয়ে তদবিরের পাশাপাশি দেশের বিভিন্ন এলাকায় নতুন ডিলার নিয়োগ ঘিরে আর্থিক লেনদেনেরও অভিযোগ উঠেছে। কোথাও ৩০ থেকে ৫০ লাখ টাকা পর্যন্ত ‘চুক্তি’ হওয়ার খবর মিলেছে।
স্থানীয় পর্যায়ে অভিযোগকারীদের কেউ কেউ বলছেন, রাজনৈতিক প্রভাবশালী ব্যক্তি বা জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে মন্ত্রণালয়ে তদবির করানোর কথা বলে আবেদনকারীদের কাছ থেকে অর্থ দাবি করা হচ্ছে। আবার কোথাও উপজেলা ও জেলা পর্যায়ের তালিকায় নাম তোলার জন্য টাকা চাওয়া হচ্ছে।
বগুড়ায় যাচাই-বাছাই নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। জেলার সিটি করপোরেশন ও ১৩ উপজেলায় ১৫৮টি ডিলার পদের বিপরীতে আবেদন পড়েছে এক হাজার ২৬৬টি। যাচাই-বাছাইয়ের পর আট শতাধিক আবেদনকারী বাদ পড়েন। বাদ পড়া আবেদনকারীদের অভিযোগ, তাদের কেন বাদ দেওয়া হয়েছে, তা জানানো হয়নি। উপজেলা পর্যায়ে আগে থেকেই একটি তালিকা তৈরি করা হয়েছিল। সেই তালিকার বাইরে থাকা অনেকের আবেদন বাদ দেওয়া হয়েছে। রাজনৈতিক পরিচয় ও প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সুপারিশকে অগ্রাধিকার দেওয়ার অভিযোগও রয়েছে। অভিযোগের স্বতন্ত্র প্রমাণ পাওয়া যায়নি।
বগুড়া জেলা কমিটির সদস্যসচিব সোহেল শামসুদ্দিন ফিরোজ বলেন, বিভিন্ন নেতার তরফে প্রতিদিনই তদবির আসছিল। এ কারণে পুরো প্রক্রিয়াটি গোপনীয়তার সঙ্গে সম্পন্ন করা হয়েছে। উপজেলা পর্যায় থেকে পাঠানো তালিকা যাচাই করে ২৪ সেপ্টেম্বর মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে।
বগুড়ার আদমদীঘির বিএনপি নেতা মাহফুজুল হক টিকন বলেন, ‘এমপির সুপারিশ ছাড়া কেউ কারও কথা শোনে না। সাতটি পদের প্রতিটিতেই এমপির কোটা রয়েছে বলে শুনেছি। তাহলে দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের স্থান কোথায়?’
একই ধরনের অভিযোগ করেন সারিয়াকান্দির বিএনপি নেতা নূর আজম বাবু। তিনি বলেন, ‘এমপির সিদ্ধান্তের বাইরে কোনো তথ্য পাওয়া যাচ্ছে না। কারা যাচাই-বাছাইয়ে বাদ পড়েছেন, সেটিও জানানো হয়নি।’
রংপুরের পীরগাছায় ৯টি ইউনিয়নের জন্য ৯জন সম্ভাব্য ডিলারের নামের তালিকা চূড়ান্ত হওয়ার আগেই সামাজিকমাধ্যমে তা ছড়িয়ে পড়ে। তালিকায় উপজেলা বিএনপির সভাপতি আমিনুল ইসলাম রাঙার স্ত্রী সুলতানা ফেরদৌসী এবং সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম ডালেজের স্ত্রী সুইটির নাম থাকার বিষয়টি স্থানীয়ভাবে আলোচনার জন্ম দেয়। সাত ইউনিয়নে ১৫ থেকে ২৭ লাখ টাকা পর্যন্ত লেনদেনের অভিযোগও উঠেছে। সব মিলিয়ে এক কোটি ৩১ লাখ টাকা লেনদেনের একটি হিসাব স্থানীয় নেতাকর্মীরা সামাজিকমাধ্যমে তুলে ধরেছেন। ডিলার নিয়োগের বিষয়ে ছড়িয়ে পড়া একটি অডিওতে ১৫ থেকে ২০ লাখ টাকা দেওয়ার প্রসঙ্গ এসেছে। তবে এ বিষয়ে শরিফুল ইসলাম ডালেজ তাঁর স্ত্রীর নাম তালিকায় থাকার কথা স্বীকার করলেও অনিয়মের অভিযোগ অস্বীকার করেন। তিনি বলেন, স্ত্রীর ব্যবসা-বাণিজ্য দেখাশোনার অভিজ্ঞতা রয়েছে।
রাজশাহীর ৭৩টি ইউনিয়ন ও ১৪টি পৌর এলাকায় নতুন ডিলারশিপের জন্য দুই হাজারের বেশি আবেদন জমা পড়েছে। এর অধিকাংশই স্থানীয় বিএনপি ও জামায়াত নেতাকর্মী। যাচাই-বাছাই শেষে প্রতিটি এলাকার জন্য তিনজনের নাম কৃষি মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। ডিলারশিপ নিশ্চিত করতে মন্ত্রী-এমপিসহ এলাকার প্রভাবশালী নেতাদের কাছে ছোটাছুটি করছেন আবেদনকারীরা। মন্ত্রী-এমপিরাও নিজেদের কাছের লোকদের ডিলারশিপ পাইয়ে দিতে মন্ত্রণালয়ে তদবির করছেন। কোথাও কোথাও বড় অঙ্কের টাকা লেনদেনও হচ্ছে।
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক আবেদনকারী বলেন, ‘শুনেছি বড় অঙ্কের টাকা লেনদেন হচ্ছে। এভাবে ডিলারশিপ দেওয়া হলে সার নিয়ে কৃষকদের যে দুর্গতি তা কোনোভাবেই কমবে না। প্রশাসনের কতিপয় অসাধু কর্মচারীরাও ত্রুটিপূর্ণ কাগজপত্র বৈধ করার শর্তে ৫০ হাজার থেকে লাখ টাকা পর্যন্ত নিচ্ছেন।’
রাজশাহীর অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) মো. সবুর আলী বলেন, ‘উপজেলা কমিটির প্রতিবেদনের আলোকে যোগ্য আবেদনকারীর তালিকা মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হয়েছে। মন্ত্রণালয় বিদ্যমান নীতিমালার আওতায় চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবে। পুরোনো ডিলারদের বিষয়েও সিদ্ধান্ত নেবে মন্ত্রণালয়।’
জানতে চাইলে রাজশাহী-২ আসনের সংসদ সদস্য ও ভূমিমন্ত্রী মিজানুর রহমান মিনু বলেন, ‘সার ডিলার নিয়োগে দলীয় প্রভাব খাটানোর অভিযোগ সঠিক নয়। আমি প্রশাসনকে আগেই বলেছি, নীতিমালার আওতায় যোগ্য আবেদনকারীকে বিবেচনা করতে হবে। কোনো প্রভাব চলবে না।’
রংপুরের আবেদনকারী কয়েকজনের অভিযোগ, সরকারি জামানতের ১০ হাজার টাকার বাইরে প্রাথমিক তালিকায় নাম তুলতে আরও দুই লাখ টাকা দিতে হয়েছে। চূড়ান্ত নিয়োগের জন্য কৃষি মন্ত্রণালয়ে তদবিরের কথা বলে আরও ১৪ থেকে ১৬ লাখ টাকা চাওয়া হচ্ছে। বিএনপি ও জামায়াতের নামধারী কয়েকজন নেতা এসব অর্থের লেনদেনে জড়িত।
বিএনপির রংপুর মহানগর কমিটির আহ্বায়ক ও রংপুর উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান শামসুজ্জামান সামু বলেন, ‘আমাদের দলের কেউ জড়িত থাকলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তবে আমি এমন অভিযোগ পাইনি। সরকারি নিয়ম মেনেই সার ডিলার নিয়োগ হবে। এতে কেউ দালালি করার জন্য টাকা নিলে লাভ হবে না।’
পাবনার সাঁথিয়ায় নতুন ডিলারশিপ পেতে ২৫ থেকে ৩০ লাখ টাকা খরচের কথা বলে একটি চক্র আবেদনকারীদের কাছ থেকে টাকা নেওয়ার চেষ্টা করছে। আবেদনকারী বকুল হোসেন বলেন, ‘সরকারি সব শর্ত মেনে আবেদন করলেও একটি প্রভাবশালী চক্র জানিয়েছে, টাকা ছাড়া ডিলারশিপ পাওয়া যাবে না।’ আরেক আবেদনকারী মতিন ফকির বলেন, ‘ধারণা করছি, ঘুষ না দেওয়ায় আমার নাম তালিকায় থাকবে না।’
গাইবান্ধার সাঘাটার পদুমশহর ইউনিয়নে সার ও কীটনাশক ডিলারের চূড়ান্ত তালিকায় কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগের এক সক্রিয় কর্মীর নামও রয়েছে। তাঁর ডিলারশিপ বাতিলের দাবি জানিয়েছেন ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি শাহিনুর ইসলাম।
নীলফামারীর ডিমলার গয়াবাড়ী ইউনিয়নে উপজেলা সার ও বীজ মনিটরিং কমিটির এক সদস্যের ছেলে ও ভাগনের নাম তালিকায় স্থান পাওয়ায় স্বজনপ্রীতির অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগকারীদের দাবি, অভিজ্ঞ ব্যবসায়ীদের বাদ দিয়ে কমিটির সদস্য অধ্যক্ষ মনোয়ার হোসেনের ছেলে মাবরুক আল ইসলাম জোয়াদ ও ভাগনে আবু তাহের সরকারের নাম তালিকায় রাখা হয়েছে। জোয়াদ জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ছাত্রলীগ নেতা ছিলেন।
এদিকে, মেহেরপুরে সার ডিলার নিয়োগে স্বজনপ্রীতি ও অনিয়মের প্রতিবাদে গত ২২ সেপ্টেম্বর জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের সামনে মানববন্ধন করেন ‘সচেতন নাগরিক সমাজ’। তারা নিয়োগ প্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা ও নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করার দাবি জানান।
তদবির ও অর্থ লেনদেনের অভিযোগের বিষয়ে কৃষি সচিব মো. সেলিম খান বলেন, সরকার নির্ধারিত মানদণ্ড কঠোরভাবে অনুসরণ করেই ডিলার নিয়োগের প্রক্রিয়া সম্পন্ন করা হবে। সবচেয়ে যোগ্য আবেদনকারীকে ডিলার নির্বাচন করা হবে। এ ক্ষেত্রে রাজনৈতিক সুপারিশ বা তদবিরকে যোগ্যতার বিকল্প হিসেবে বিবেচনা করা হবে না। নির্ধারিত শর্ত পূরণ করাই হবে প্রার্থী নির্বাচনের মূল ভিত্তি।
অর্থ লেনদেনের অভিযোগের বিষয়ে তিনি বলেন, কোনো আবেদনকারীর কাছ থেকে ডিলার নিয়োগের জন্য টাকা নেওয়া হয়েছে– এমন অভিযোগ এখন পর্যন্ত মন্ত্রণালয়ের কাছে আসেনি। কেউ নির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণসহ অভিযোগ দিলে বিষয়টি যাচাই করা হবে। আবেদন যাচাইয়ের কাজ এখনও চলমান। বিপুলসংখ্যক আবেদন থাকায় যাচাই-বাছাইয়ে সময় লাগছে। ফলে সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া কোনো তালিকা বা স্থানীয় পর্যায়ে আলোচিত কোনো নামকে চূড়ান্ত তালিকা হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। মন্ত্রণালয় থেকে আনুষ্ঠানিক তালিকা প্রকাশের আগ পর্যন্ত এসব তালিকার বৈধতা নেই। সমকাল
দেশের অভ্যন্তরে নন-ইউরিয়া সার পরিবহনের জন্য বাংলাদেশ কৃষি উন্নয়ন করপোরেশনের (বিএডিসি) আহ্বান করা দুটি দরপত্রে কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান অংশ নেয়নি। গত মঙ্গলবার দরপত্র জমা দেওয়ার শেষ দিন ছিল। ঠিকাদারদের অভিযোগ, একটি প্রভাবশালী গ্রুপের হুমকি ও আতঙ্কের কারণে তারা দরপত্র জমা দিতে যাননি।
কেউ অংশ না নেওয়ায় বিএডিসিকে নতুন করে দরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া শুরু করতে হয়েছে। এতে সময়মতো ঠিকাদার নিয়োগ করা না গেলে দেশে আসা সারের সরবরাহে জটিলতা তৈরি হতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।
এরই মধ্যে আজ বৃহস্পতিবার বাংলাদেশ কেমিক্যাল ইন্ডাস্ট্রিজ করপোরেশনের (বিসিআইসি) ইউরিয়া সার পরিবহনের জন্য ঠিকাদার নিয়োগের দরপত্র জমা দেওয়ার কথা রয়েছে। বিএডিসির ঘটনায় ঠিকাদারদের মধ্যে আতঙ্ক তৈরি হওয়ায় এই দরপত্রেও তারা অংশ নেবেন কিনা, তা নিয়ে সংশয় দেখা দিয়েছে।
সংশ্লিষ্টরা বলছেন, আগামী এক-দুই দিনের মধ্যে সংযুক্ত আরব আমিরাত (ইউএই) থেকে ৪০ হাজার টন সারের একটি চালান দেশের বন্দরে পৌঁছানোর কথা। সময়মতো পরিবহন ঠিকাদার নিয়োগ করা না গেলে সার বন্দরে পড়ে থাকতে পারে। এতে একদিকে কৃষক পর্যায়ে সার সরবরাহে দেরি হতে পারে, অন্যদিকে জাহাজ বন্দরে অবস্থান করায় বাড়তি জরিমানার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
বিএডিসি সূত্রে জানা গেছে, গত ১৬ সেপ্টেম্বর একাধিক দৈনিক পত্রিকায় বিজ্ঞপ্তি দিয়ে ৪০ হাজার টন এমওপি সার পরিবহনের দরপত্র আহ্বান করা হয়। একই দিনে আরও ৩৫ হাজার টন এমওপি সার পরিবহনের জন্য পৃথক দরপত্র আহ্বান করা হয়। দুটি দরপত্রের জমাদানের শেষ সময় ছিল ২৯ সেপ্টেম্বর দুপুর ১২টা। তবে নির্ধারিত সময়ের মধ্যে কোনো ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান দরপত্র জমা দেয়নি।
বিএডিসির একটি সূত্র জানিয়েছে, বাংলাদেশ ফার্টিলাইজার অ্যাসোসিয়েশনের (বিএফএ) সদস্যদের মধ্যে একটি প্রভাবশালী গ্রুপ এ নিয়ে আতঙ্ক তৈরি করে। সংগঠনটির সদস্য ও জাতীয়তাবাদী কৃষক দল ঢাকা মহানগর দক্ষিণের আহ্বায়ক মো. কামাল হোসেনের নেতৃত্বে একটি দল মঙ্গলবার বিএডিসির সার ব্যবস্থাপকের কার্যালয়ে গিয়ে হুমকি দেয় বলে অভিযোগ উঠেছে। তাদের সঙ্গে সমঝোতা ছাড়া কেউ যেন দরপত্র জমা না দেন, এমন বার্তা দেওয়া হয় বলে সূত্রের দাবি। এরপর বিএডিসির পক্ষ থেকে সম্ভাব্য দরদাতা কয়েকটি প্রতিষ্ঠানকে ফোন করে সতর্ক করা হয়। তাদের নিজস্ব নিরাপত্তাব্যবস্থা ছাড়া দরপত্র জমা দিতে না যাওয়ার পরামর্শ দেওয়া হয় বলে জানা গেছে।
একাধিক ঠিকাদার সমকালকে বলেন, কৃষক দলের নেতাদের একটি গ্রুপের লোকজন বিএডিসির আশপাশে ও দপ্তরে অবস্থান করছিলেন। এ কারণে তারা আতঙ্কে দরপত্র জমা দিতে যাননি।
জাতীয়তাবাদী কৃষক দল ঢাকা মহানগর দক্ষিণের সভাপতি কামাল হোসেন বলেন, ‘সময় ম্যানেজ করতে না পারায় আমরা নিজেরাই দরপত্রে অংশ নিতে পারিনি। কেউ কাউকে হুমকি দেয়নি।’
বিএডিসির সার ব্যবস্থাপকের কার্যালয়ে বুধবার আরেকটি লটের ৩০ হাজার টন সার পরিবহনের জন্য দরপত্র জমা নেওয়া হয়। পুলিশের উপস্থিতিতে বিএডিসির কর্মকর্তারা অপেক্ষা করলেও নির্ধারিত সময়ের মধ্যে মাত্র একটি দরপত্র জমা পড়ে। শেখ জসিম উদ্দিনের মালিকানাধীন আকিজ রিসোর্স নামের প্রতিষ্ঠানটি দরপত্র জমা দেয়।
বিএডিসির ঘটনায় বিসিআইসির দরপত্র নিয়েও শঙ্কা তৈরি হয়েছে। ইউরিয়া সার পরিবহনের জন্য ঠিকাদার নিয়োগে আজ দরপত্র জমা দেওয়ার কথা।
বিএডিসির সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, দুটি দরপত্রে কোনো প্রতিষ্ঠান অংশ না নেওয়ায় স্থানীয়ভাবে সার পরিবহনের জন্য পুনঃদরপত্র আহ্বানের প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে।