এস এম নাজমুল হক ইমন :: পাহাড়, ঝরনা, জলাধার আর সবুজের বাইরে একটি গন্তব্যের আরেকটি পরিচয় আছে, সেখানে বসবাস করা মানুষ। পর্যটনের নতুন বাংলাদেশ গড়তে হলে সেই মানুষকেই করতে হবে পর্যটনের সবচেয়ে বড় অংশীদার।
বাংলাদেশের পর্যটন মানচিত্র খুললে কয়েকটি নাম বারবার সামনে আসে কক্সবাজার, সুন্দরবন, সেন্ট মার্টিন, সাজেক, বান্দরবান, রাঙামাটি, সিলেট, কুয়াকাটা কিংবা জাফলং। এসব গন্তব্যের নিজস্ব পরিচিতি তৈরি হয়েছে। পর্যটক আসে, হোটেল-রিসোর্ট গড়ে উঠেছে, পরিবহন ও খাবারের ব্যবসা তৈরি হয়েছে। কিন্তু এই পরিচিত গন্তব্যগুলোর বাইরে যে বাংলাদেশ পড়ে আছে, তার গল্প আমরা কতটা জানি? দেশের বিভিন্ন প্রান্তে ছড়িয়ে আছে পাহাড়ি গ্রাম, নদীঘেরা জনপদ, বিল-হাওর, রাবারবাগান, চা-বাগান, বন, ঝরনা, স্থানীয় খাবার, কারুশিল্প, লোকজ সংস্কৃতি এবং মানুষের এমন জীবনযাপন; যা একজন পর্যটকের জন্য একটি সম্পূর্ণ নতুন অভিজ্ঞতা হতে পারে। প্রশ্ন হলো, এই জায়গাগুলোকে কি শুধু ‘নতুন ঘোরার জায়গা’ হিসেবে দেখা হবে? নাকি এগুলোকে এমন পর্যটন গন্তব্যে পরিণত করা সম্ভব, যেখানে একজন পর্যটকের ভ্রমণ স্থানীয় মানুষের আয় বাড়াবে, তরুণদের কর্মসংস্থান তৈরি করবে, নারীদের উদ্যোক্তা হওয়ার সুযোগ দেবে এবং একই সঙ্গে প্রকৃতি ও সংস্কৃতিকে সংরক্ষণ করবে? এই প্রশ্নের একটি বাস্তব উদাহরণ পাওয়া যায় বান্দরবানের নাইক্ষ্যংছড়ির বৈশারী ও কাগজিখোলা এলাকায়।
পর্যটনের মানচিত্রে যে জায়গাটি এখনও খুব বড় নয়
নাইক্ষ্যংছড়ির বৈশারীকে দূর থেকে দেখলে হয়তো বাংলাদেশের আরও অনেক পাহাড়ি এলাকার মতোই মনে হতে পারে। কিন্তু একটু গভীরে গেলে দৃশ্যটি বদলে যায়। সবুজ পাহাড়, স্বচ্ছ পানির নীলাদ্রি লেক, বিস্তৃত রাবারবাগান, স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সংস্কৃতি, ঐতিহ্যবাহী খাবার, হস্তশিল্প, গ্রামীণ জীবন সব মিলিয়ে এখানে একটি পর্যটন গন্তব্যের প্রয়োজনীয় অনেক উপাদানই রয়েছে। বাংলাদেশের মূল পর্যটন মানচিত্রে জায়গাটি এখনো কক্সবাজার বা বান্দরবান শহরের মতো পরিচিত নয়। কিন্তু এই ‘অপরিচিতি’ই হয়তো ভবিষ্যতের সবচেয়ে বড় সুযোগ। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ড, ট্যুর অপারেটরস অ্যাসোসিয়েশন অব কক্সবাজার এবং জাতিসংঘ উন্নয়ন কর্মসূচি UNDP-এর সহযোগিতায় কাগজিখোলা গ্রামকে কমিউনিটি-বেইজড ট্যুরিজমের সম্ভাবনাময় এলাকা হিসেবে নিয়ে কাজ শুরু হয়েছিল ২০২১ সালে। ২০২২ সালে প্রয়োজন নিরূপণ ও স্থানীয় জনগোষ্ঠীর সঙ্গে কর্মশালার পর পর্যটনসেবা বিষয়ে প্রশিক্ষণ শুরু হয়। ২০২৩-২৪ সালে এ উদ্যোগের অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ, অবকাঠামো উন্নয়ন এবং টেকসই পর্যটন বিষয়ে কাজ চালানো হয়। এখানে পর্যটনের গল্পটি শুধু পাহাড় বা লেকের গল্প নয়। এটি মানুষের গল্প।
একটি পর্যটন গন্তব্যের আসল সম্পদ কী?
একটি পাহাড় আছে। একটি লেক আছে। একটি রাবারবাগান আছে। এগুলোকে পর্যটন আকর্ষণ বলা যায়। কিন্তু একজন পর্যটক সেখানে গিয়ে কী করবেন? এই প্রশ্নের উত্তর থেকেই তৈরি হয় পর্যটন পণ্য। ধরা যাক, একজন পর্যটক বৈশারীতে গেলেন। তিনি শুধু নীলাদ্রি লেক দেখে ফিরে এলেন না। স্থানীয় একজন তরুণ তাকে গাইড করলেন। পথে তিনি রাবারবাগান দেখলেন। স্থানীয় পরিবারের তৈরি খাবার খেলেন। স্থানীয় কোনো হস্তশিল্প কিনলেন। কোনো একটি পরিবারের হোমস্টেতে রাত কাটালেন। স্থানীয় মানুষের কাছ থেকে শুনলেন এলাকার ইতিহাস ও সংস্কৃতির গল্প। তাহলে তার ভ্রমণ শুধু একটি ‘স্পট ভিজিট’ থাকল না। এটি হয়ে উঠল একটি পূর্ণাঙ্গ পর্যটন অভিজ্ঞতা। আর এই অভিজ্ঞতার অর্থনৈতিক মূল্যও তখন অনেক বেশি। কারণ পর্যটকের খরচ একটি হোটেলের ঘরেই আটকে থাকছে না। তা ছড়িয়ে যাচ্ছে গাইড, পরিবহন, খাবার, হোমস্টে, কারুশিল্প, স্থানীয় দোকান এবং অন্যান্য সেবায়। এটাই কমিউনিটি-বেইজড ট্যুরিজমের অন্যতম মূল ধারণা। UNDP-এর ২০২৪ সালের বৈশারী-কাগজিখোলা বিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ওই এলাকার স্থানীয় অর্থনীতি কৃষিনির্ভর এবং কৃষির বাইরে কর্মসংস্থানের সুযোগ সীমিত। প্রতিবেদনে টেকসই পর্যটনকে স্থানীয় মানুষের জীবিকার বৈচিত্র্য আনার একটি সম্ভাব্য পথ হিসেবে দেখানো হয়েছে।
একজন পর্যটক মানেই একটি পরিবারের সম্ভাব্য আয়
পর্যটনের সবচেয়ে বড় শক্তি এখানেই। একজন পর্যটক যখন একটি প্রত্যন্ত এলাকায় যান, তখন তার অর্থনৈতিক প্রভাব শুধু একটি ব্যবসায় সীমাবদ্ধ থাকার কথা নয়। একটি পরিবার হোমস্টে পরিচালনা করতে পারে। একজন তরুণ গাইড হতে পারে। একজন নারী স্থানীয় খাবার তৈরি করে বিক্রি করতে পারেন। আরেকজন নারী হস্তশিল্প তৈরি করতে পারেন। একজন চালক পর্যটক পরিবহনের সঙ্গে যুক্ত হতে পারেন। কেউ স্থানীয় ফল, মধু, কৃষিপণ্য বা অন্য কোনো পণ্য বিক্রি করতে পারেন। অর্থাৎ, একটি পর্যটন সফর অনেকগুলো ছোট আয়ের উৎস তৈরি করতে পারে। এখানে পর্যটনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য আছে, এটি স্থানীয় অর্থনীতির বিভিন্ন স্তরের মানুষকে একই সঙ্গে যুক্ত করতে পারে। তবে তার জন্য পর্যটনের মালিকানা ও সিদ্ধান্ত গ্রহণের জায়গায় স্থানীয় মানুষকে রাখতে হবে। শুধু বাইরে থেকে বিনিয়োগ এনে একটি রিসোর্ট বানালেই কমিউনিটি-বেইজড ট্যুরিজম হয় না। বরং প্রশ্ন করতে হবে, এই গন্তব্যের মানুষ পর্যটন থেকে কতটা আয় করছেন? তারা কি প্রশিক্ষণ পাচ্ছেন? তারা কি সিদ্ধান্ত নেওয়ার জায়গায় আছেন? তাদের সংস্কৃতি ও সম্পদের ওপর তাদের অধিকার কতটা সুরক্ষিত?
বৈশারীতে যে পরিবর্তনের শুরু
কাগজিখোলা ও বৈশারীর অভিজ্ঞতার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলোর একটি হলো, এখানে স্থানীয় মানুষকে শুধু পর্যটক গ্রহণকারী হিসেবে দেখা হয়নি; তাদের দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। UNDP-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে ১৫ দিনের একটি প্রশিক্ষণ কর্মসূচিতে ৯০ জন স্থানীয় মানুষ অংশ নেন। তাদের মধ্যে ছিলেন ৩০ জন নারী, ৩০ জন অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মী এবং ৩০ জন তরুণ। নারীদের হস্তশিল্প, পশুপালন ও কাঁচামাল বিপণনের মতো বিষয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়; অনানুষ্ঠানিক খাতের কর্মী ও তরুণদের পর্যটনসেবা এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গন্তব্য প্রচারের দক্ষতা বাড়ানোর উদ্যোগ নেওয়া হয়। নারী পর্যটকদের সেবা দিতে নারী ইকো-গাইড তৈরির বিষয়েও কাজ করা হয়। এখানে একটি বড় শিক্ষা আছে। পর্যটন উন্নয়ন মানেই শুধু রাস্তা, ব্রিজ, হোটেল বা রিসোর্ট তৈরি করা নয়। মানুষের দক্ষতা তৈরি করাও পর্যটন অবকাঠামোর অংশ। একজন প্রশিক্ষিত স্থানীয় তরুণ হয়তো আগামী দিনে একজন গাইড হবেন। একজন প্রশিক্ষিত নারী হয়তো নিজের তৈরি পণ্য পর্যটকের কাছে বিক্রি করবেন। একটি পরিবার হয়তো হোমস্টে চালাবে। একজন স্থানীয় উদ্যোক্তা হয়তো পর্যটকদের জন্য খাবার, পরিবহন বা বিনোদনের ব্যবস্থা করবেন। এভাবেই একটি গন্তব্যের পর্যটন অর্থনীতি স্থানীয় মানুষের হাতে ছড়িয়ে পড়তে পারে।
পর্যটন শুধু অর্থনীতি নয়, পরিচয়েরও বিষয়
বাংলাদেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের অনেক মানুষের কাছে তাদের খাবার, পোশাক, গান, গল্প, কারুশিল্প কিংবা উৎসব দৈনন্দিন জীবনের অংশ। একজন পর্যটকের কাছে সেটিই হতে পারে বিরল অভিজ্ঞতা। একটি পাহাড়ি গ্রামের ঐতিহ্যবাহী খাবার কোনো আন্তর্জাতিক পর্যটকের জন্য একটি নতুন গ্যাস্ট্রোনমি অভিজ্ঞতা হতে পারে। একজন স্থানীয় কারুশিল্পীর তৈরি পণ্য হয়ে উঠতে পারে স্মারক। একটি স্থানীয় লোককথা হয়ে উঠতে পারে গাইডেড ট্যুরের অংশ। একটি গ্রামের কৃষিকাজ হয়ে উঠতে পারে এগ্রিট্যুরিজমের অভিজ্ঞতা। অর্থাৎ, পর্যটন পণ্য সবসময় নতুন করে তৈরি করতে হয় না। অনেক সময় স্থানীয় মানুষের জীবনেই পর্যটন পণ্য লুকিয়ে থাকে। প্রয়োজন শুধু সেটিকে সম্মানজনক, দায়িত্বশীল এবং বাজারযোগ্যভাবে উপস্থাপন করা। বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের গবেষণা ও গাইডলাইন তালিকায় কমিউনিটি-বেইজড ট্যুরিজমের পাশাপাশি টেকসই, দায়িত্বশীল, গ্রামীণ, গ্যাস্ট্রোনমি, নদী, বন্যপ্রাণী, কৃষি, সাংস্কৃতিক ও অ্যাডভেঞ্চার পর্যটন নিয়ে পৃথক গাইডলাইন রয়েছে। অর্থাৎ, দেশের পর্যটন নীতির কাঠামোতেও এখন পর্যটনকে একমাত্র ‘দর্শনীয় স্থান’কেন্দ্রিক না রেখে বহুমাত্রিক পর্যটন পণ্যের দিকে নেওয়ার সুযোগ তৈরি হয়েছে।
কিন্তু পর্যটক বাড়ানোই কি সব?
না। এই প্রশ্নটি না করলে অজানা গন্তব্য জনপ্রিয় করার প্রচারণা উল্টো ক্ষতির কারণ হতে পারে। একটি সুন্দর পাহাড়ি গ্রামে হঠাৎ হাজার হাজার পর্যটক গেলে কী হবে? প্লাস্টিক বাড়বে। বর্জ্য বাড়বে। পানির ওপর চাপ পড়বে। গাড়ির চাপ বাড়বে। শব্দদূষণ হতে পারে। স্থানীয় সংস্কৃতিতে চাপ তৈরি হতে পারে। বন্যপ্রাণী বিরক্ত হতে পারে। স্থানীয় মানুষের দৈনন্দিন জীবন ব্যাহত হতে পারে। এমনকি যে প্রকৃতি পর্যটককে আকর্ষণ করে, পর্যটকের চাপেই সেটি ধীরে ধীরে নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই বাংলাদেশের নতুন পর্যটন গন্তব্যের ক্ষেত্রে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন শুধু ‘কীভাবে পর্যটক আনব’ নয়। প্রশ্ন হতে হবে, কতজন পর্যটক এই জায়গা ধারণ করতে পারে? বাংলাদেশের পর্যটন উন্নয়নে carrying capacity বা পর্যটন গন্তব্যের ধারণক্ষমতা তাই গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কোথায় গাড়ি থামবে? কোথায় নির্মাণ করা যাবে? কোথায় নির্মাণ করা যাবে না? একদিনে কতজন পর্যটক গ্রহণ করা সম্ভব? বর্জ্য কোথায় যাবে? পানির ব্যবস্থা কী হবে? স্থানীয় মানুষের জন্য কোন এলাকা সংরক্ষিত থাকবে? প্রকৃতি ও জীববৈচিত্র্যের ওপর পর্যটনের প্রভাব কীভাবে পর্যবেক্ষণ করা হবে? এসব প্রশ্নের উত্তর না থাকলে পর্যটন উন্নয়ন দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হবে না।
‘কতজন’ নয়, ‘কেমন’ পর্যটক, সেটিও গুরুত্বপূর্ণ
একজন দায়িত্বশীল পর্যটক একটি গন্তব্যের জন্য সম্পদ হতে পারেন। তিনি স্থানীয় গাইড নেবেন। স্থানীয় খাবার খাবেন। স্থানীয় পণ্য কিনবেন। বর্জ্য ফেলবেন না। প্রকৃতির ক্ষতি করবেন না। স্থানীয় সংস্কৃতিকে সম্মান করবেন। স্থানীয় মানুষের ব্যক্তিগত পরিসরকে সম্মান করবেন। অন্যদিকে, শুধু বেশি সংখ্যক পর্যটক এনে যদি তাদের ব্যয়ের বড় অংশ গন্তব্যের বাইরে চলে যায়। তাহলে পর্যটকের সংখ্যা বাড়লেও স্থানীয় মানুষের লাভ সীমিত থাকতে পারে। তাই পর্যটনের সাফল্যের মাপকাঠি শুধু ভিজিট নাম্বার হওয়া উচিত নয়। দেখতে হবে, স্থানীয় মানুষের আয় কতটা বাড়ল? স্থানীয় কর্মসংস্থান কতটা তৈরি হলো? নারী কতটা যুক্ত হলেন? তরুণদের কতটা সুযোগ তৈরি হলো? স্থানীয় পণ্য কতটা বিক্রি হলো? প্রকৃতি কতটা সুরক্ষিত থাকল? বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কতটা কার্যকর হলো? স্থানীয় মানুষ পর্যটনের বিষয়ে কতটা সন্তুষ্ট? এই প্রশ্নগুলোর উত্তরই একটি গন্তব্যের প্রকৃত সাফল্য বুঝতে সাহায্য করবে।
একটি গ্রামের শত পরিবারের সম্ভাবনা
UNDP-এর বৈশারী-কাগজিখোলা বিষয়ক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এলাকায় ১০০-এর বেশি পরিবার রয়েছে এবং অনেক পরিবারকে ধীরে ধীরে হোমস্টে সেবায় যুক্ত করার সম্ভাবনা রয়েছে। একই প্রতিবেদনে আরও প্রশিক্ষণ, প্রযুক্তিগত সহায়তা, লজিস্টিক সহায়তা এবং দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনার প্রয়োজনীয়তার কথাও উল্লেখ করা হয়েছে। এখানেই বাংলাদেশের অজানা গন্তব্যগুলোর জন্য একটি বড় শিক্ষা পাওয়া যায়। প্রতিটি পরিবারকে হোটেল বানাতে হবে না। বরং কয়েকটি পরিবার মানসম্মত হোমস্টে পরিচালনা করতে পারে। কয়েকজন তরুণ গাইড হতে পারেন। কেউ পরিবহন পরিচালনা করতে পারেন। কেউ খাবার তৈরি করতে পারেন। কেউ স্থানীয় পণ্য বিক্রি করতে পারেন। কেউ সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে গন্তব্য প্রচার করতে পারেন। এভাবে একটি গ্রামের অর্থনীতিতে পর্যটনের ছোট ছোট দরজা খুলে দেওয়া সম্ভব।
পর্যটন উন্নয়নে গণমাধ্যমের ভূমিকা কোথায়?
কোনো জায়গার সম্ভাবনা আবিষ্কার করা শুধু পর্যটন কর্তৃপক্ষের কাজ নয়। গণমাধ্যমও পারে একটি অপ্রচলিত গন্তব্যকে জাতীয় আলোচনায় আনতে। তবে সেখানে একটি দায়িত্ব আছে। শুধু সুন্দর ছবি তুলে ‘অসাধারণ’, ‘স্বর্গ’, ‘অজানা কাশ্মীর’ বা ‘বাংলাদেশের লুকানো সুইজারল্যান্ড’ ধরনের তুলনা করে পর্যটক পাঠানো সাংবাদিকতার কাজ হতে পারে না। একজন পর্যটন সাংবাদিকের কাজ হলো সৌন্দর্যের পাশাপাশি বাস্তবতাও দেখানো। যদি রাস্তা খারাপ হয়, সেটি বলতে হবে। যদি নিরাপত্তা সমস্যা থাকে, সেটিও বলতে হবে। যদি বর্জ্য ব্যবস্থাপনা না থাকে, সেটিও তুলে ধরতে হবে। যদি স্থানীয় মানুষের আয় না বাড়ে, সেই প্রশ্নও করতে হবে। একই সঙ্গে সম্ভাবনাটিও দেখাতে হবে। কারণ পর্যটন সাংবাদিকতা শুধু পর্যটককে কোথায় যেতে হবে তা বলে না; পর্যটন কীভাবে আরও ভালো হতে পারে, সেই আলোচনাও তৈরি করে।
বাংলাদেশ এখন নতুনভাবে পর্যটনকে দেখার সুযোগ পাচ্ছে
বাংলাদেশ ট্যুরিজম বোর্ডের বর্তমান ওয়েব প্ল্যাটফর্মে পর্যটন মহাপরিকল্পনা, ট্যুরিজম ডাটা ইনভেন্টরি, পর্যটন আকর্ষণ এবং কমিউনিটি-বেইজড ট্যুরিজমকে আলাদা গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। এটি গুরুত্বপূর্ণ একটি পরিবর্তনের ইঙ্গিত দেয়। কারণ বাংলাদেশের পর্যটন যদি শুধু কয়েকটি জনপ্রিয় গন্তব্যে সীমাবদ্ধ থাকে, তাহলে পর্যটনের অর্থনৈতিক সুবিধাও নির্দিষ্ট কিছু এলাকার মধ্যেই বেশি কেন্দ্রীভূত থাকবে। অন্যদিকে, দেশের বিভিন্ন অঞ্চলের নতুন ও কম পরিচিত গন্তব্যকে পরিকল্পিতভাবে উন্নয়ন করা গেলে পর্যটনের অর্থনৈতিক কার্যক্রম ছড়িয়ে দেওয়া সম্ভব। তবে ‘নতুন গন্তব্য’ মানেই নতুন করে সবকিছু নির্মাণ করা নয়। বরং স্থানীয় সম্পদকে চিহ্নিত করা। স্থানীয় মানুষকে প্রশিক্ষণ দেওয়া। স্থানীয় উদ্যোক্তা তৈরি করা। প্রয়োজনীয় অবকাঠামো উন্নয়ন করা। নিরাপত্তা নিশ্চিত করা। ডিজিটাল প্রচারণা করা। বর্জ্য ব্যবস্থাপনা তৈরি করা। পর্যটকের ধারণক্ষমতা নির্ধারণ করা এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ, স্থানীয় মানুষকে সিদ্ধান্ত গ্রহণের কেন্দ্রে রাখা।
অজানা গন্তব্যের ভবিষ্যৎ কোথায়?
বৈশারী ও কাগজিখোলার গল্প বাংলাদেশের জন্য একটি সম্ভাবনার জানালা খুলে দেয়। দেশের অন্য জায়গাতেও এমন অসংখ্য সম্ভাবনা আছে। কোনো নদীর পাড়ে। কোনো পাহাড়ি গ্রামে। কোনো হাওরের পাশে। কোনো পুরোনো জমিদারবাড়িতে। কোনো চা-বাগানের ভেতরে। কোনো আদিবাসী বা ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর জনপদে। কোনো গ্রামীণ খাবারের ঐতিহ্যে। কোনো স্থানীয় উৎসবে। কোনো কারুশিল্পের গ্রামে। প্রতিটি জায়গাকে আলাদা করে দেখতে হবে। কোথাও হতে পারে রিভার ট্যুরিজম। কোথাও কমিউনিটি-বেইজড ট্যুরিজম। কোথাও ইকো-ট্যুরিজম। কোথাও এগ্রিট্যুরিজম। কোথাও গ্যাস্ট্রোনমি ট্যুরিজম। কোথাও অ্যাডভেঞ্চার ট্যুরিজম। কোথাও সাংস্কৃতিক পর্যটন। বাংলাদেশের শক্তি হয়তো একটি বিশাল পর্যটনকেন্দ্রে নয়; বরং ছোট ছোট অসংখ্য পর্যটন অভিজ্ঞতার সমষ্টিতে।
শেষ কথা : পর্যটনের কেন্দ্রবিন্দুতে মানুষ
একটি পর্যটন গন্তব্যের সৌন্দর্য পর্যটককে টানে। কিন্তু একটি গন্তব্যকে দীর্ঘদিন টিকিয়ে রাখে মানুষ। পাহাড়ের সৌন্দর্য একজন পর্যটককে একবার নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু স্থানীয় একজন গাইডের গল্প তাকে আবার ফিরিয়ে আনতে পারে। একটি সুন্দর লেক ছবি তুলতে বাধ্য করতে পারে। কিন্তু স্থানীয় পরিবারের আতিথেয়তা সেই ভ্রমণকে স্মৃতিতে পরিণত করতে পারে। একটি হস্তশিল্প পর্যটকের হাতে স্মারক হয়ে যেতে পারে। কিন্তু সেই পণ্যের সঙ্গে জড়িয়ে থাকা মানুষের গল্পই তাকে আলাদা মূল্য দেয়। এই কারণেই বাংলাদেশের পর্যটনের পরবর্তী অধ্যায় শুধু নতুন গন্তব্য খোঁজার অধ্যায় হওয়া উচিত নয়। এটি হওয়া উচিত নতুন মানুষকে পর্যটনের অর্থনীতির অংশীদার করার অধ্যায়। আমরা যদি সত্যিই বাংলাদেশের পর্যটনকে দেশের প্রত্যন্ত মানুষের জীবন ও জীবিকার সঙ্গে যুক্ত করতে চাই, তাহলে একটি প্রশ্ন দিয়ে প্রতিটি নতুন গন্তব্যের পরিকল্পনা শুরু করা যেতে পারে, এই জায়গায় পর্যটক এলে স্থানীয় মানুষের কী লাভ হবে? এর উত্তর যদি ইতিবাচক হয়, তাহলে সেই পর্যটন শুধু একটি ব্যবসা নয়। এটি উন্নয়নের একটি পথ। এটি কর্মসংস্থানের একটি পথ। এটি নারী উদ্যোক্তা তৈরির একটি পথ। এটি তরুণদের জন্য নতুন সম্ভাবনার পথ। এটি স্থানীয় সংস্কৃতি টিকিয়ে রাখার একটি পথ। এবং সঠিকভাবে পরিচালিত হলে এটি প্রকৃতি সংরক্ষণেরও একটি শক্তিশালী উপায় হতে পারে। বাংলাদেশের পর্যটনের ভবিষ্যৎ হয়তো সবচেয়ে পরিচিত সমুদ্রসৈকত, পাহাড় বা শহরে নয়। হয়তো সেই ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছে এমন কোনো গ্রামের পাশে, যেটির নাম এখনো দেশের অধিকাংশ মানুষ জানেন না। সেই গ্রামের মানুষকে যদি পর্যটনের দর্শক না বানিয়ে অংশীদার করা যায়, তাহলে একজন পর্যটকের ভ্রমণ শুধু তার নিজের আনন্দের গল্প থাকবে না। সেটি হয়ে উঠবে একটি পরিবারের আয় বাড়ার গল্প। একজন তরুণের কর্মসংস্থানের গল্প। একজন নারীর উদ্যোক্তা হয়ে ওঠার গল্প। একটি সংস্কৃতি টিকে থাকার গল্প। একটি প্রকৃতি রক্ষা পাওয়ার গল্প। আর তখনই পর্যটন সত্যিকার অর্থে মানুষের জীবন বদলানোর শক্তি হয়ে উঠবে।
লেখক: এস এম নাজমুল হক ইমন, সিনিয়র রিপোর্টার, আউটলুক বাংলা